অপপ্রচারে আ’লীগ-বিএনপি

0
31

সোহানুর রহমান:  ‘বিএনপি জিতলে নগরের উন্নয়ন হবে না’- এই প্রচার সামনে নিয়েই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগ। খুলনা ও গাজীপুরে এই প্রচার কাজে দিয়েছে বলে মনে করছে দলটি।

তবে অপ্রচারও রয়েছে। গুজব উঠেছে ‘আগাম পরাজয় মেনে নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির সরোয়ার’। কিছু স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টালের অসমর্থিত সূত্র ধরে প্রকাশিত গুজবে চারদিকে বলাবলি হচ্ছে সরোয়ার মরিয়া হয়ে সিটি নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা চালাবেন না। প্রার্থী হিসেবে যতটুকু প্রচার চলানো দরকার ততটুকুই চালাবেন। ভোট কেন্দ্র পাহাড়া দিতেও কোন শক্ত পদক্ষেপ নেবেন না তিনি। তাঁর টার্গেট জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

এমন অপপ্রচারে অনেক আ’লীগ সমর্থক উল্লাসিত হলেও একে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সরোয়ার।

হাবভাব ও দলীয় সূত্রে বোঝা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রচারের মূল কেন্দ্রে রয়েছে উন্নয়ন। বিরোধী দলের প্রার্থী মেয়র হওয়ার কারণে বরিশাল নগরের মানুষ উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে অর্থাৎ আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হলেই উন্নয়ন হবে- এটাই বোঝাতে চাইছে ক্ষমতাসীন দলের নের্তৃবৃন্দ। তাই আর বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিয়ে ভুল না করে পরিবর্তনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ বরিশাল গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে দলটি।

প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণ মেয়র থাকা অবস্থায় প্রচুর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও মেয়র আহসান হাবিব কামাল নগরের তেমন দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন করতে পারেননি। এই ব্যর্থ বিএনপি নেতার ওপর এমনিতেই ক্ষুব্দ নাগরিকদের প্রচারণার মাধ্যমে হাওয়া দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারও তাঁর ও বিএনপি আমলের উন্ণয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন।

যদিও বিএনপি মনে করছে, খুলনা ও গাজীপুরে সরকারি প্রশাসন ব্যবহার করে বিএনপিকে মাঠছাড়া করা হয়েছে। আসন্ন সিটি নির্বাচনেও একই ভয় তাদের মধ্যে প্রবল। তাই সবসময়েই শঙ্কা প্রকাশ করছে তারা। এ জন্য খুলনা ও গাজীপুরের পরিস্থিতি এড়াতে এজেন্ট বাছাই ও ভোটকেন্দ্র পাহারায় নতুন কৌশলের খোঁজে বিএনপি।

আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু না হলেও এরই মধ্যে প্রতিদ্বন্ধী মেয়র প্রার্থীরা নানা কায়দায় মাঠে নেমে পড়েছেন। তাঁরা সৌজন্য সাক্ষাত, শুভেচ্ছাবার্তা বিনিময়, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান, পেশাজীবী সংগঠন ও দলীয় নানা ফোরামের মাধ্যমে কৌশলে চালাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা।

তবে নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে এখনো তেমন খুব একটা উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে না।

বরিশাল সিটি নির্বাচনে দুই দলের প্রার্থীই বেশ প্রভাবশালী। পরিচিতিও আছে বেশ। ফলে জয় দেখছে দুই দলই। অন্যান্য দলের প্রার্থী মাঠে থাকলেও ভোটারদেরও ধারণা, প্রতিদ্বন্ধিতা হবে প্রধান দুই দলের মধ্যেই।

যদিও বরিশালে বিএনপির অবস্থান বরাবরই শক্ত। দলটির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ নির্বাচনে কখনোই হারেননি। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথমম মেয়র তিনি। তিনি সদর আসন থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দলের মহানগর সভাপতি এবং কেন্দ্রিয় যুগ্ম মহাসচিবও। যেকোনো বিবেচনায় সরোয়ার বিএনপির শক্ত প্রার্থী।

যদিও তিনি মুখিয়ে ছিলেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য। শেষ পর্যায়ে তাকে একরকমের বাধ্য হয়ে সিটি নির্বাচনে নামতে হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ্ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সন্তান। যুবরত্ন হিসেবে জনপ্রিয়তা রয়েছে যুব সমাজের মাঝে। পুরো বরিশাল বিভাগের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর বাবা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ব্যপক প্রভাব রয়েছে।

জানা গেছে, বরিশাল সিটিতে ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৩১ হাজার নতুন ভোটার। আওয়ামী লীগ নবীন প্রার্থী দিয়ে এই নতুন ভোটারদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে সাংগঠনিক দক্ষতা আর অতীতে নির্বাচনী রাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঠে আছেন বিএনপির প্রার্থী।

সবাই বলছে, নবীন আর প্রবীণ প্রার্থীর মধ্যেই শক্ত লড়াই হবে।

এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত সব কটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট পেয়েছে। কিছু স্থানে তাদের অবস্থান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরই।

বরিশালেরই চরমোনাই পীর যেহেতু এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা। বরিশাল সিটি নির্বাচনে তাদের একটা প্রভাব থাকবে বলেই মনে করছেন ভোটাররা। ২০০৮ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৭ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে তারা তৃতীয় অবস্থানে ছিল। তাই এবারের তাদেও প্রার্থী হয়েছেন হেফাজতে ইসলাম নেতা ওবায়দুর রহমান মাহবুব।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, খুলনা ও গাজীপুরে প্রশাসনের চাপে বিএনপি মাঠছাড়া হয়ে গেছে। ফলে অনায়াসে জয় পেয়ে গেছে আওয়ামী লীগ। এই কৌশল থেকে আসন্ন তিন সিটির ভোটেও বিএনপিকে সংঘবদ্ধ শক্তি হিসেবে মাঠ দখলের সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। তিন সিটিতে জয় ছাড়া কিছু ভাবছে না আওয়ামী লীগ।

তেমনটাই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ফারুক খান। তার মতে, বাংলাদেশের মানুষ বায়বীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। তারা উন্নয়নের গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। মানুষ বুঝে গেছে, উন্নয়ন করার সক্ষমতা আওয়ামী লীগেরই আছে। খুলনা ও গাজীপুরে তা প্রমাণিত। আসন্ন তিন সিটিতেও তা-ই হবে।

বরিশাল মহানগর বিএনপির নেতারা বলছেন, সিটি নির্বাচনের পর বর্তমান সরকারের মেয়াদ থাকবে দুই থেকে আড়াই মাস। এটাই ভোটার ও দলের নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা। যাতে ভোট কেন্দ্রে শক্তি ধরে রাখেন। বিএনপির ধারণা, নেতা-কর্মীরা মাঠে থাকতে পারলে এবং ভোটাররা ভোট দিতে পারলে তিন সিটিতেই তাদের জয় হবে। এজন্য সাহসী এজেন্টও খুঁজছে দলটি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে। এগুলো হচ্ছে শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে বিরোধীদের মাঠছাড়া করা, বিএনপির পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া, ভোট কেন্দ্র জবরদস্তি, আওয়ামী লীগ না জিতলে উন্নয়ন হবে না-এই প্রচার এবং নির্বাচন কমিশনের নির্বিকার ভূমিকা। ইসি নিজের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করলে সরকারি দল অন্য সুবিধাগুলো নিতে পারত না। তাই আসন্ন তিন সিটি নির্বাচন কেমন হবে, তা নির্ভর করছে কমিশনের ভূমিকার ওপর।

উল্লেখ্য, ৩০ জুলাই রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনে ভোট গ্রহণ করার দিন ধার্য করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৯ জুলাই প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। প্রতীক বরাদ্দ ১০ জুলাই। এরপর থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জোরেশোরে প্রচারণা শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা।