আর কতকাল একই কর্মস্থলে কাজ করবেন ‘ফাইলবাজ’ শ্যামল?

0
485
  • এম.লোকমান হোসাঈন।।

মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশ সরকারী কোন কর্মচারী একই কর্মস্থলে ২ থেকে ৩ বছরের বেশি সময় না রাখার। অথচ, সেই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখার অফিস সহকারী শ্যামল চন্দ্র শীল ২০১৩ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত একই শাখায় কর্মরত আছেন। শুধু এমন নয়, চাকরি পেয়ে পূর্বপুরুষের বংশও পরিবর্তন করে ফেলেছেন তিনি। পূবেৃ ছিলেন শ্যামল চন্দ্র শীল। আর বর্তমানে হয়েছেন শ্যামল চন্দ্র রায়।

শ্যামলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের ফাই ঘুষ ছাড়া বন্দি আবার ঘুষের বিনিময় দুর্নীতিবাজদের ফাইল ফেলে রাখেন হিমাগারে। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসাদচারণ, আধিপত্যবিস্তারসহ এন্তার অভিযোগ। এমনকি প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকতাদের সু-কৌশলে জিম্মি করে রাখারও কথা শোনা গেছে।

শ্যামল ২০১৩ সালের শেষের দিকে বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখায় তদবিরের মাধ্যমে যোগদান করেন। তারও প্রায় ২ বছর আগে তিনি একই শাখায় কর্মরত ছিলেন। সংস্থাপন শাখার মত আর অন্যকোন শাখা তার পছন্দ হইনি বলে পূণরায় সেই একই শাখায় তদবির করে যোগদান করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

শ্যামল যে ফাইল আটক করে বিভিন্নজনকে জিম্মি করে তার প্রমাণ পাওয়া গেল এক অবিযোগকারীকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদশৃণের মাধ্যমে। জানা গেছে, কাশিপুর ২৮ নং-ওয়ার্ডের নবজাগরণী এলাকার বাসিন্দা মোসলেম আলী হাওলাদারের ছেলে মোঃ আরিফ মাহমুদ হিজলা উপজেলা নির্বাহী অফিসের অফিস সহকারী মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনার বরাবর ১৬/০৮/২০১৭ইং তারিখে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। বিভাগীয় কমিশনার ওই মাসের ২৮ তারিখে অভিযোগটি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসক বরাবর প্ররণ করেন। যার স্মারক নম্বর ২৮২।

অভিযোগের অগ্রগতি সম্পর্কে আরিফ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখার অফিস সহকারী শ্যামল চন্দ্র শীল ও তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ মাহাবুবুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে, প্রথমে অভিযোগের ফাইল নিয়ে ভয়ভীতি দেখায় এবং ফাইল চালু করার জন্য টাকা দাবী করে বলে জানায় আরিফ। এনিয়ে সময়ের বার্তায় সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি দ্রুত ধামা-চাপা দিতে অভিযুক্ত মিজানুর রহমানের বর্তমান কর্মস্থল অথাৎ হিজলা উপজেলা নিবার্হী অফিসারের কার্যালয়ে আরিফকে স্বাক্ষী দিতে মোবাইল এর মাধ্যমে খবর দেওয়া হয়।

মিজানের বিচার চেয়ে, আরিফ হিজলাতে না গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার বরাবর পূণ:রায় ২০/১০/২০১৭ ইং তারিখ আরও একটি আবেদন করেন। আরিফের দাবী, শ্যামল ও মাহবুবকে টাকা না দেওয়ায় এবং তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার কারনেই আরিফকে অযথা হিজলা উপজেলার কার্যালয়ে বেআইনিভাবে যেতে বলা হয়। ওই অভিযোগে উল্লেখ করে, বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অধিনে বর্তমানে হিজলা উপজেলা নির্বাহী অফিসে কর্মরত অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং নগরীর কাশিপুর ২৮ নং ওয়ার্ড নবজাগরণী এলাকার বাসীন্দা মৃত আব্দুল মালেক হাওলাদার এর ছেলে মিজানুর রহমান একজন চরিত্রহীন লোক। সে প্রভাব খাটিয়ে স্টর্ম নামীয় রেজিস্ট্রেশন বিহীন (গাড়ীর পিছনে ডিসিপুল লেখে অবৈধভাবে মটরসাইকেল ব্যবহার করছেন এবং কাশিপুর এলাকাতে স্কুল কলেজের মেয়েদের রাস্তাঘাটে উত্যাক্ত করাই এই সরকারি কর্মচারীর নেশা।

চলতি বছরের ৮ আগস্ট রাতে নবজাগরণী এলাকায় ওই এলাকার বাসীন্দা মোসলেম আলী হাওলাদারের বসত ঘরে যুবতীদের যৌন হয়রানি করতেগেলে মোসলেম আলী হাতে নাতে আটক করে মিজানকে। এসময়ে স্থানীয় বাসীন্দা মৃত মোঃ আশরাফ আলী আকনের ছেলে আবুল কালাম আজদ, মৃত কাঞ্চন (পুলিশের) ছেলে শাহাদাত, মৃত্যু সুরাত গাজীর ছেলে মোঃ মোতাহার গাজীসহ প্রায় ২০ / ২৫ জন প্রতিবেশী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পরবর্তীতে মিজানুর উপস্থিত সকলের সামনে হাত-পা ধরে পার পায়। মিজান পরের দিন অথাৎ ০৯/০৮/২০১৭ইং মোসলেম আলী হাওলাদারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে নবজাগরণী সড়কে মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক খান এর বাড়ীর সম্মুখে মোসলেম আলীকে প্রত্যাক্ষদশী আবুল কালাম আজাদ, সুজন গাজী ও মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক খান এর সামনে মারধর এবং ঝাড়–পেটা করে। এ ঘটনায় এয়ারপোর্ট থানায় ওইদিন একটি জিডি করে মোসলেম।

 

জিডি নং-৩৩১/১৭। জিডির খবর পেয়ে মিজানুর রহমান ক্ষিপ্ত হয়ে মোসলেম আলী হাওলাদার ও তার ছেলে আরিফ মাহামুদকে খুন জখমের পরিকল্পনা করে আসছেন বলে দাবী করেছে মোসলেমের পরিবার। উপায়ন্তর না পেয়ে মোসলেম আলীর ছেলে আরিফ মাহমুদ, মিজানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনার বরাবর গত ১৬/০৮/২০১৭ইং অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ করেন, মিজান ২০১৪ সালে আগৈলঝাড়া উপজেলায় চাকরী করাকালীন সময় ওই এলাকায় রাতে একটি বাড়ীতে প্রবেশ করে জনৈক যুবতীর শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করার সময় স্থানীয়দের হাতে ধরা পরে। পরে আগৈলঝাড়ার ইউএনও ওই বাড়ী থেকে মুসলেকার শর্তে মিজানকে নিয়ে আসে। এবিষয় মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা হয়। মামলা নং-১/২০১৪-২০১৫।

মিজানের অদৃশ্য ক্ষমতার কাছে মামলাটি হিমাগারেই পরে আছে বলে জানা গেছে। ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, টাকার বিনিময় বরিশাল জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাজী মাহাবুবু রহমান ও সংস্থাপন শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক শ্যামল চন্দ্র রায়ের কাছে অভিযোগের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অভিযোগদান কারী আরিফ মাহমুদ ও তার পরিবারকে উল্টা পুলিশে দেয়ার হুমকি দেন। আরিফের দাবী মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগকৃত ফাইল চালু করতে সংস্থাপন শাখার অফিস সহকারী শ্যামল ও মহাবুব মোটা অংকের টাকাও দাবী করেছেন। আরিফ টাকা দিতে অস্বিকার করায় মিজানের ফাইল অটকে রেখেছে। দ্বিতীয়বার অভিযোগের অনুলিপি মন্ত্রী পরিষদ, বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি,বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, বরিশাল জেলা প্রশাসক ও হিজলা উপজেলা নিবার্হী অফিসার বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।

এরই প্রেক্ষিতে চলতি মাসের ১৭ তারিখ সহকারী কমিশনার মো.মিজানুর রহমানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে আরিফ মাহমুদকে উপস্থিত হয়ে তার বক্তব্য পেশ করার জন্য জানানো হয়েছে। অভিযুক্ত মিজানুর রহমানেরর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের জুলাই মাসের ৮ তারিখ মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ এর জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি পরিবীক্ষণ অধিশাখা এর অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন) মোঃ মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারীর স্বাক্ষরিত এক আদেশে ০৪.০০.০০০০.৫১৩.৩৫.০৩৭.২০১৫-১৯১ নম্বর স্মারক এ মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মচারীদের বদলি সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করা হয়Ñ ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পর্যায়ের সাধারণ ও রাজস্ব প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মচারীদের একই পদে কিংবা একই কর্মস্থলে তিন বছর মেয়াদ পূর্ণ হলে বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় সাধারণত অন্যত্র বদলি করার রেওয়াজ রয়েছে।

এসব দপ্তরে নিয়োজিত কোন কোন কর্মচারী একই পদে তিন বছরের অধিককাল কর্মরত থাকায় তারা সংশিষ্ট বিষয়ে অধিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যান্য বিষয় অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তা ছাড়া একই পদে র্দীঘদিন কর্মস্থলে থাকায় কোন কোন কর্মচারী দুর্নীতি,অর্থ আত্মসাৎ,স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। বলে উক্ত স্মারকের পরিপত্রে উল্লেখ করা হলেও দীর্ঘদিন যাবৎ নির্দেশ অমান্য করা হচ্ছে বলে পূণ:রায় ২৩/১১/২০১৭ তারিখ বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের একান্ত সচিব মোঃ তরিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত (যার স্মারক নম্বর ০৫.১০.০০০০.০০২.০৫.০১৯.১৭.৩৮১ (৬))।

বরিশাল বিভাগের সকল জেলাতে মাঠ পর্যায়ে ইউনিয়ন,উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পর্যায়ের সাধারণ ও রাজস্ব প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মচারীদের একই কর্মস্থলে ০৩ (তিন) বছরের অধিককাল কর্মরত কর্মচারীদেরকে পদায়য়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্রোক্ত স্মারকের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ পূর্বক জরুরী ভিত্তিতে কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যায়ের সংস্থাপন-২ শাখাতে অবহিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করেছেন।