ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের অপচিকিৎসায় লাশ হলো ইভা

0
805

বরিশাল অফিস॥ ‘আমার মায় পুরাই সুস্থ্য। হাটাইয়া হাসপাতালে নিয়া শোয়াইছি। তখন মোবাইলে গেইমস খেলতে ছিল। নার্স আইসা নিয়া গেল। তারপর আর কোন কথা হয় নাই। মাইয়ার লাশ কান্ধে কইরা বাড়ি নিয়া আইতে হইছে।’

কথাগুলো চরকাউয়া ইউনিয়নের নয়ানী গ্রামের বাসিন্দা সুলতানের স্ত্রী কমলা বেগমের। বরিশাল নগরের বান্দ রোডস্থ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে মেয়ে সুমাইয়া আক্তার ইভাকে চিকিৎসা দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। কমলা বলেন, ডাক্তার কইছে ভুলতো হইয়া গেছে। এখন আপনার যা লাগে সব আমি দেখবো। তিনি আর কি দেকবেন। আমার পরান পাখিতো উইড়া গেছে। টাকা-পয়সা-দুনিয়াদারি সব আইনা দিলেওতো এখন আর আমার মাইয়াটা ফিইর‌্যা পামু না।’

 

এরপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সন্তান হারানো এই মা। জানা গেছে, দূর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী সুমাইয়া আক্তার ইভা (১৪) ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের নিয়মিত চিকিৎসক এবং পটুয়াখালী সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার মনিরুল আহসানের ভুল চিকিৎসায় মারা গেছে। নয়ানীর মানুষ বলছে, এটা এক ধরনের খুন। খুন না হলে ইভা মারা যাওয়ার পরে ওই পরিবারের সমস্ত খরচ বহনের প্রস্তাব মনিরুল আহসান কেন দিবেন সেই প্রশ্নও তুরেছেন গ্রামবাসী। দূর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, তিনিও শুনেছেন ডাক্তার অপারেশনে ভুল করায় তার ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল সুত্রে জানা গেছে, এপেনডিসাইটসে আক্রান্ত সুমাইয়া আক্তার ইভা ২৭ অক্টোবর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ডা: মনিরুল আহসানের স্ত্রী ডা: তানিয়া আফরোজের চিকিৎসা সেবা নিতে ভর্তি হন (কেবিন নং-৫২২, রেজি নং- ৮৪৫৭)।

ভর্তি হওয়ার পর তানিয়া আফরোজ জানায় ইভার অপারেশন করাতে হবে। এই ডাক্তার তার স্বামী মনিরুল আহসানের কাছে প্রেরণ করেন। ইভার পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, ওই দিনই অপারেশনের তারিখ নির্ধারণ করে ডাক্তার। ইবঅর মা কমলা বেগম জানান, আমরা না বলি নাই। যেহেতু এপেনডিসাইটস তাই আজ কাল একদিন অপারেশন করাতেই হবে। ফলে প্রাথমিক অবস্থাতে করালেই বিপদ চলে যায়। ইভার পরিবারের দাবী, ইভা সামান্য পেটে ব্যাথা অনুভব করলেও খুব বেশি অসুস্থ্য কখনোই ছিল না। ওই দিন অপারেশন করাতে নিয়ে যখন যায় তখনও স্বাভাবিক এবং সুস্থ্য ছিল। অপারেশন শেষে যখন কেবিনে ফিরিয়ে দিয়ে যায় তখন থেকেই একটু একটু অসুস্থ্য হয়ে পড়তে থাকে।

 

অপারেশনের পর ডা: মনিরুল আহসান নিয়মানুযায়ী খাবার বন্ধ রাখতে বললেও অপারেশনের স্থান থেকে ময়লা পড়তে থাকে। এই ময়লা বন্ধ করানোর জন্য ইভার স্বজনদের জানানো হয় আবারো অপারেশন করতে হবে। সে অনুযায়ী ১ নভেম্বর পুনরায় অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় ইভাকে। জানা গেছে, দুপুরে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলেও ইভাকে রাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয় তার পিতামাতার কাছে। ওইদিন রাত ১২টার দিকে প্রচন্ড অসুস্থ্য ইভা মারা যায়।

হাসপাতালের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, অপারেশনে ডা: মনিরুল আহসান পেটের ভিতরের অনেকাংশ কেকটে ফেলেন। যে কারনে পরিপাকতন্ত্রের কোন কিছুই ঠিক থাকে না ইভার। আর সে কারনেই মৃত্যুবরণ করে ইভা। ওই সূত্রের দাবী, এ ধরনের অপারেশন প্রতিদিনই হয়ে থাকে। বড় কোন ভুল না হলে রোগীর মৃত্যু হওয়ার কথা নয়।
মনিরুল আহসানের ভুল চিকিৎসায় ইভার মৃত্যু হলে বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অবস্থা প্রতিকূল দেখায় ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সুপারেনটেন্ড এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ডা: ইকবালুর রহমান ডেকে নেন চরকাউয়ার চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ছবিকে। বিষয়টি ছবির মাধ্যম্যে ম্যানেজ করা হয়।

ইকবালুর রহমান বলেন, রোগী মৃত্যুর সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ে স্বজনদের কান্নাকাটির মাধ্যমে। তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। অলি ভাই (ছবি চেয়ারম্যানের ভাই) এসেছিলেন। বিষয়টি ম্যানেজ করা হয়েছে। ভুল অপারেশনে মৃত্যুবরণ করা ইভার স্বজনদের ‘পার্টি’ উল্লেখ করে বলেন, পার্টি এখন আমাদের ডিস্টার্ব করছে না।

ওদিকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের বিরুদ্ধে নিযমিতই অপারেশনে ভুল করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডা: তানিয়া আফরোজের অপচিকিৎসায় নবজাতকের মৃত্যু, অপারেশন করে রোগীর পেটের ভিতরে গজ কাপড় রেখে সেলাই করে দেওয়া। ডা: মনিরুল আহসানের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, প্রতিবন্ধী এক রোগীকে চারবার অপারেশন করাসহ বিবিধ অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালটিতে নিয়মিতই ঘটে রোগী হয়রানি ও স্বজন লাঞ্ছনার ঘটনা।