একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ আকুতি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করার’

0
110

দিনাজপুর প্রতিনিধি।। এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি ছেলেকে চাকরিচ্যুৎ ও বাস্তুচ্যুৎ করে পেটে লাথি মেরেছে। তাই মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা হিসেবে তাদের সালাম/ স্যালুট শেষ যাত্রার কফিনে চাননি মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন।

পুত্রের চাকরিচ্যুতির ঘটনার ক্ষোভ জানিয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে লেখা চিঠির ২৪ ঘণ্টা পরই ওই বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা যান।

আর মৃত্যুর অসিয়ত অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার লিখে যাওয়া এমন চিঠির প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই তাকে দাফন করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশকে ফিরিয়ে দিয়েছে পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী।

চিঠিতে লিখে যাওয়া অসিয়ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অব অনার) ছাড়াই দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানের শেষ বিদায়ের সময় সেখানে বিগউলে বাজেনি বিদায়ের সুর।

জানাজার পূর্ব মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের চৌকষদল গার্ড অব অনার জানাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের লাশ জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করা হয়নি।

দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এর ২৪ ঘণ্টা আগে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম বরাবর এমন ক্ষোভের চিঠি লেখেন তিনি।

চিঠিতে যা লিখে গেছেন তার মূল কথা হচ্ছে, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সুপারিশে ছেলে নূর ইসলামের নো ওয়ার্ক নো পে ভিত্তিতে এসিল্যান্ডের গাড়িচালক হিসেবে চাকরি হয় গত ২০১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। সেই সুবাদে নূর ইসলাম সদর এ্যাসিল্যান্ডের গাড়ি চালাতেন।

কর্মস্থলে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নূর ইসলাম। এ সময় তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে সেখানে উপস্থিত এডিসি রাজস্বকে বিষয়টি দেখতে বলেন।

হুইপকে বিষয়টি অবগত করায় প্রশাসন থেকে প্রথমে নূর ইসলামকে তার বসবাসরত খাস পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেয়া হয়।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এ্যাসিল্যান্ডের স্ত্রী নূর ইসলামকে বাথরুম পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন। মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকরিচ্যুৎ করা হয়।

পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেলা প্রশাসকও ক্ষিপ্ত হয়ে যান। এ ছাড়াও নূর ইসলাম তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য এ্যাসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দেখা করতে পারেনি।

চাকরি চলে যাওয়ায় উপায় না পেয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে দেখা করেন মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন। কিন্তু প্রশাসন সেটি চরম নেগেটিভভাবে নেয়। বর্তমানে তার ছেলেটি চাকরিচ্যুৎ ও বাস্তচ্যুৎ হয়ে স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবণযাপন করছে।

তিনি চিঠিতে আরও লিখেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়ে করা স্বাধীন দেশে আমার ছেলের রুজি-রোজগারটুকুও অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া হল। গত ২১ অক্টোবর তারিখ থেকে এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দিনাজপুরের কার্ডিওলজি বিভাগে, ওয়ার্ড নং-২,বেড নং-৪৪-এ ভর্তি অবস্থায় আছি, এই পত্রটি তোমার কাছে লিখছি। তোমার কাছে আমার আকুল আবেদন, তুমি ন্যায় বিচার কর। ঠুনকো অজুহাতে আমার ছেলেটিকে চাকরিচ্যুৎ করায় তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কর।’

তিনি লেখেন, ‘আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ করে চাকরিচ্যুৎ হওয়ায় একেই তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছি। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুৎ, বাস্তুচ্যুৎ করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম/ স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না।’

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২২ অক্টোবর চিঠিটিতে তিনি স্বাক্ষর করে ডাকযোগে ঢাকায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির বরাবরে প্রেরণ করেন। পরের দিন ২৩ অক্টোবর বেলা ১১টার সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আবস্থায় মারা যান। বৃহস্পতিবার ২৪ অক্টোবর বেলা ১১টায় সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের জানাজা নামাজ শুরুর পূর্বমহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের একটি চৌকষদল গার্ড অব অনার প্রদান করার জন্য যান।

এ সময় স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা তাদের পিতার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লিখে যাওয়া চিঠি অনুয়ায়ী তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন বা গার্ড অব অনার প্রদান করতে দিবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। তাদের ভাষায় এটাই হবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মরহুম ইসমাইল হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

জানাজার আগে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের পরিবার-পরিজন দায়িত্ব দিলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল জানাজা নামাজে উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, অন্যায়ভাবে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের ছেলেকে চাকরিচ্যুৎ করা হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এই চিঠি লিখে গেছেন। আমরা তার লিখে যাওয়া চিঠির ওসিয়ত অনুয়ায়ী দাফন করতে চাই। চিকিৎসার জন্য তিনি অনেকের কাছে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন।

গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেটকে ছেলেরা বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বেতন পান। একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এমন অবহেলা, এর চেয়ে লজ্জার কী হতে পারে। এ কারণেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নূর ইসলামের চাকরি স্থায়ী ছিল না। তাছাড়া তার গাড়ি চালানো ভালো ছিল না এবং কয়েকবার দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। চাকরিচ্যুতির বিষয়টি তিনি জানেন না, এটি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রশাসন থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়ার পর বিষয়টি অবগত হই।

তিনি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে না দেয়ায় তা প্রদান করা সম্ভব হয়নি।