এবার ‘কথার যুদ্ধে’ আইভী-শামীম

0
146

সময়ের বার্তা ।।

সংঘর্ষের পর দিন বাকযুদ্ধে জড়ালেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের দুই আলোচিত ও দাপুটে নেতা মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান।

মঙ্গলবারের সংঘর্ষের জন্য একে দায়ী করেছেন অপরজনকে। আইভী বলেছেন, অস্ত্র নিয়ে এসেছে শামীমের লোকজন, অন্যদিকে শামীম বলেছেন, অভিযোগ তুলেছেন অস্ত্র নিয়ে এসে হামলা করেছে আইভীর লোকজন।
নারায়ণগঞ্জে মঙ্গলবারের এই ঘটনা তোলপাড় হয়েছে সরকারে। ঢাকা থেকে ডাক পড়েছে আইভী ও শামীমের ওসমানের। এর মধ্যেও কথার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন দুই জন।

গত ডিসেম্বরে উচ্ছেদ করা হকারদেরকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে সোচ্চার শামীম। সোমবার বেঁধে দেয়া ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষে মঙ্গলবার শহরে দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে হয় ব্যাপক সংঘর্ষ। এ সময় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।

পরদিন বুধবার শহরে উত্তেজনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল শান্ত। আর এদিক আইভী ও শামীমের সঙ্গে কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। জানিয়েছেন, দুই জনকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়েছে।

এর মধ্যে বুধবার আলাদা সংবাদ সম্মেলন করেছেন শামীম ও আইভী। দুপুরে সিটি করপোরেশনের কাজ শেষ করে সাংবাদিকদের ডাকেন আইভী। অন্যদিকে বেলা সাড়ে তিনটায় নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন শামীম।

আইভীর অভিযোগ, শামীম ওসমানের নির্দেশে তাকে হত্যার জন্য হামলা হয়েছে। অন্যদিকে শামীম বলেছেন, যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা আইভী বনাম শামীম ওসমান নয়। এটা হকার বনাম আইভীর বিষয়।

সংঘর্ষের সময় পিস্তল হাতে ছবি উঠা নিয়াজুল ইসলাম শামীম ওসমানের এক সময়ের কর্মী বলে অভিযোগ করেন আইভী। আর শামীম পাল্টা ছবি দেখিয়ে বলেছেন, আইভীর কমীর কোমড়ে ছিল পিস্তল। তারা আবার বিএনপির কর্মী।

বিএনপির ক্যাডার নিয়ে এসেছে আইভী: শামীম

শামীমের অভিযোগ মঙ্গলবারের প্রকৃত ঘটনা অনেকেই সঠিকভাবে তুলে ধরেনি। আর গুলি করেছে আইভীর লোকজন। আর হামলার শিকার হয়ে নিয়াজুল তার লাইসেন্স করা পিস্তল বের করেছিলেন।

‘বিএনপি ক্যাডার ও জোড়া খুনের আসামি বেষ্টিত হয়ে আইভীর মিছিল থেকে গুলি করা হয়েছে।’
শামীমের অভিযোগ, আইভীর মিছিল থেকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও কাউন্সিলর বিভা হাসানের সন্ত্রাসী বাহিনী হকারদের উপর হামলা করেছে। বিভা হাসান এ শহরের  বিএনপির সন্ত্রাসী এমএ মজিদ ও হাসানের পরিবারের সদস্য।

এ সংক্রান্ত ছবিও সংবাদ সম্মেলনে দেখান শামীম ওসমান। একটি স্থীরচিত্র দেখিয়ে বলেন, ‘এর নাম সুমন, সে যুবদলের ক্যাডার। তার হাতে দেখেন অস্ত্র। সুফিয়ানের হাতের অস্ত্রটি জানি লাইসেন্স করা। কিন্তু এ সুমনের অস্ত্রটি কীসের?’।

শামীম বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকালে আমাকে পুলিশ থেকে জানানো হলো আইভী মিছিল করে আসবেন। আমি তখন হকারদের বলে দিলাম কেউ কোন বাধা দেবে না। আইভী তার কাজ করুক। কিন্তু পরে জানলাম আইভী বিএনপির যুবদলের আহবায়ক মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, বিএনপির ক্যাডার সুমন, জোড়া খুনের মামলার আসামির লোকজন বেষ্টিত হয়ে মিছিল নিয়ে আসলো।’

‘তাদের মিছিল চাষাঢ়ায় আসার পর সুমন নামের একজনকে গুলি করতে দেখা গেছে। সঙ্গে থাকা সুফিয়ানকেও (জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক) দেখলাম অস্ত্র বের করে গুলি করতে। কিন্তু এগুলো মিডিয়াতে আসে নাই।’

নিয়াজুলের পিস্তল নিয়ে যা বললেন শামীম

সংঘর্ষের সময় পিস্তল হাতে যার ছবি গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে সেই নিয়াজুল ইসলাম শামীম ওসমানের কর্মী হিসেবে পরিচিত।

শামীম ওসমান বলেন, নিয়াজুলের পিস্তলটি লাইসেন্স করা। তার তার ওপর তিন দফায় হামলার পর আহত হয়ে তিনি এটি বের করেন। কিন্তু তাকে মারধর করে সেটি ছিনিয়ে নিয়েছে আইভী সমর্থকরা। আর এ বিষয়ে মামলা নিচ্ছে না থানা।

‘সরকার তাকে আত্মরক্ষার জন্য পিস্তল দিয়েছে। তার কাছ থেকে পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে আবার তাকে মারধর করা হয়েছে।’

এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ সাংবাদিকদের দেখান শামীম ওসমান। বলেন, ‘দেখুন এ ভিডিওটি প্রমাণ করে নিয়াজুল কখন তার পিস্তলটি বের করেছিল। এখন দেখার বিষয় পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়েছে কি না। সেই পিস্তল থেকে কোন গুলি বের হয়েছে কি না। সেই গুলি কারো গায়ে লেগেছে কি না।’

শামীম বলেন, ‘বার বার নিয়াজুলকে শামীম ওসমানের লোক বলা হলো। প্রকৃত হলো নিয়াজুল এক সময়ে আমাদের কর্মী ছিল। নিয়াজুল হলো নজরুল ইসলাম সুইটের ছোট ভাই। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে কারাগারে থাকা সুইটকে বাইরে এনে হত্যা করা হয়েছে।’

‘সেই সুইটের ভাই মঙ্গলবার বিকেলে একা একা হেঁটে আসার সময়ে মিছিল থেকে তিনবার মাটিতে ফেলে ১০ মিনিট ধরে পেটানো হয়। চতুর্থবার বাধ্য হয়ে নিয়াজুল লাইসেন্স করা পিস্তল বের করে।’

‘খবর পেয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল গেলে তার মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। তার পরেও বলবো যদি নিয়াজুল সেখানে কোন অন্যায় করে থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সে কোন গুলি করলে সেটাও তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

আইভীকে ‘পাস করিয়েছেন’ শামীম

২০১৬ সালের মেয়র নির্বাচনে আইভীকে পাস করানো হয়েছে বলেও দাবি করেন শামীম। বলেন, ‘নির্বাচনে আমি কী করেছি, কীভাবে পাস করিয়েছি, দল করি তো তাই সব বলতে পারছি না। আমাকে ধন্যবাদ তো দূরের কথা আমার বাবাকে নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। আমাকে নিয়েও কথা বলা হচ্ছে।’

আইভী ভদ্রতা জানে না বলেও মন্তব্য করেন শামীম। বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে আইভীকে ফুফু বলে ডাকে। আমি আইভীর বাসায় গিয়েছিলাম তাকে ও তাঁর মাকে দাওয়াত দিতে। এক ঘণ্টা বাসার নিচে অপেক্ষার পরেও কেউ নিচে নেমে আসেনি। এক ভাই এসে কার্ড নিয়ে গেছে।’

হামলা আমাকে হত্যার জন্য: আইভী

অন্যদিকে মেয়র আইভী তার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তাকে হত্যা করার জন্য হামলা করিয়েছেন শামীম ওসমান।

আইভী বলেন, ‘এই হামলায় আমার বোন জামাই, ভাই, কর্মীরা গুরুত্বর আহত হয়েছেন। আমি মার খেতে প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু কর্মীরা মার খাবে তা আমি কখনোই চাইনি। আমার ধারণা ছিল আমি ওখানে বসা থাকলে এ হামলা হবে না কিন্তু তা হয়েছে। আমার কর্মীদের টার্গেট করে মারা হয়েছে। শামীম ওসমানের ক্যাডার নিয়াজুল অস্ত্র নিয়ে হামলা করেছে।’

বিএনপির ক্যাডার ও অস্ত্র নিয়ে মিছিল বিষয়ে শামীম ওসমানের অভিযোগের বিষয়ে আইভী বলেন, ‘আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে হাজার হাজার মানুষ আসে। তো কাউকে ডেকে আনিনি, আমি তো অস্ত্র নিয়ে মিছিলে যাইনি। আমার ফুটপাত দিয়ে আমি হেঁটে সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন সম্পর্কে জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আগের দিন ঘোষণা দিয়ে, আদেশ করে উস্কে দিয়ে হামলা করিয়েছেন শামীম ওসমান।’

‘একমাস আগেও আমার গাড়ির ছয়টি নাট একসাথে খুলে যায়। আমাকে হত্যা চেষ্টা নতুন না, কিন্তু মৃত্যুর ভয় আমি পাই না।’

হকার উচ্ছেদের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের চিঠির জবাব দেয়ার কথা জানিয়ে আইভী বলেন, ‘আমি সেলিম ওসমানের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি, চিঠি দিয়েছি। যেখানে প্রশাসন বসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, সেখানে কেন এমন হামলা করা হলো?’।

হকার উচ্ছেদের বিষয়ে মেয়র বলেন, ‘রাস্তা আমার, আর আমি হাঁটতে পারব না, তা তো হতে পারে না। আমরা প্রায়ই উচ্ছেদ করি আর ২৫ তারিখ থেকে পুলিশ প্রশাসন উচ্ছেদ করছে এটা ভালো করেছে, মানুষের জন্য কাজ করেছে।