ওনার আগে সরে যাওয়া উচিত ছিল: প্রধানমন্ত্রী

0
67

সময়ের বার্তা ডেস্ক।।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধণী অবৈধ ঘোষণার রায় এবং রায়ের পর্যবেক্ষণে অনেক ভুল আছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, সংসদে নারী আসনে নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করার আগে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ করা উচিত ছিল।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার স্মরণে সোমবার বিকালে রাজধানীতে এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। ১৩ বছর আগের গ্রেনেড হামলা ছাড়াও সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আপিল বিভাগের রায় নিয়েও দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। কথা বলেন, রবিবার উচ্চ আদালতে প্রধান বিচারপতির করা মন্তব্য নিয়ে।

গত ৩ জুলাই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগ। গত ১ আগস্ট প্রকাশ হওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় সংসদ, আইন প্রণয়ন পদ্ধতি, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন, দেশের উন্নয়ন, শাসন পদ্ধতিসহ নানা বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করা হয়। এসব মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে সরকার। তবে এ বিষয়ে এতদিন প্রধানমন্ত্রী নিজে থেকে কিছু বলেননি।

তবে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ১৩ বছর পূর্তির দিনে এসে দেয়া বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়েই প্রধান বিচারপতির কথা উল্লেখ করে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে উচ্চ আদালত থেকে দেখছি নানা ধরনের বক্তব্য, রাজনৈতিক কথাবার্তা এবং হুমকি ধামকি।’

‘আমার মাঝেমাঝে অবাক লাগে যে, যাদেরকে আমরাই নিয়োগ দিয়েছি, মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছেন এবং এই নিয়োগ পাওয়ার পর হঠাৎ তাদের বক্তব্য শুনে এবং পার্লামেন্ট সম্পর্কে যে সমস্ত কথা বলা হচ্ছে, পার্লামেন্ট সদস্য যারা তাদেরকে ক্রিমিনাল বলা হচ্ছে, সেখানে ব্যবসায়ী আছে, সেটাও বলা হচ্ছে। তো ব্যবসা করাটা কি অপরাধ?’

‘সরে যাওয়া উচিত ছিল’

সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। সরাসরি ভোটের বদলে ৫০ সদস্য সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন।

‘এটা একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এবং এটা সংবিধানসম্মত হয়েছে’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি তার রায়ে মন্তব্য করেছেন যে মহিলাদের কেন এভাবে নির্বাচিত করা হয়।’

রাষ্ট্রপতিও সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করেন আর সেই রাষ্ট্রপতিই নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতিকে। তাহলে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ নির্বাচন করতে পারবে আর সেই রাষ্ট্রপতির দ্বারাই নির্বাচিত হয়ে চেয়ারে বসে নিজের কথা ভুলে গেলেন?’।

‘মহিলা সংসদ সদস্যরা যদি নির্বাচিত হতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হতে পারে? পার্লামেন্টারি সিস্টেম অব ডেমোক্রেসিতে তো এটা আছে।’

‘ওনার (প্রধান বিচারপতি) তো এই কথা বলার আগে এই পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত ছিল’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই পার্লামেন্ট যেহেতু মহিলা এমপি করতে পারবে না, এই পার্লামেন্ট যেহেতু রাষ্ট্রপতি করতে পারবে না আর এই রাষ্ট্রপতি যেহেতু আমাকে নিয়োগ দিয়েছে, আমি এই পদে থাকব না-বলে দিলেই তো হলো।’

‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে না বলেই ওনার গোসসা’

সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কেড়ে নিতে চান বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ যে ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে, সে ক্ষমতা তিনি কেড়ে নেন কীভাবে? সেটা দেয়া হচ্ছে না বলেই যত রাগ আর গোসসা। ’

অ্যাটর্নি জেনারেলকে নিয়ে আদালতে ‘যা তা’ মন্তব্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেন?’।

রায়ে ‘ভুল’ মন্তব্য

আইন প্রণয়নের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি রায়ের পর্যবেক্ষণে ভুল মন্তব্য করেছেন বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো আইন করতে হলে প্রথমে মন্ত্রণালয় খসড়া তৈরি করে এরপর মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দিলে তা ভ্যাটিংয়ে যায়। এরপর আবার তা অনুমোদনের পর সংসদে যায়। সেখানে সংশোধনী আনার প্রস্তাব আসে। এরপর তা যায় সংসদীয় কমিটিতে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আবার তা সংসদে আসে। সেখানে আবারও সংশোধনী প্রস্তাব এলে তা যাচাই বাছাই করে আইন পাস হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এত যাচাই বাছাইয়ের পর যে আইনটা আমরা করে দেই এবং সংবিধান সংশোধনে দু থার্ড মেজরিটি লাগে, দু থার্ড মেজরিটি দিয়েই সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। আর এক কলমের খোঁচায় সেটা নাকচ করে দেওয়া…’

‘তার মানে এতগুলো সংসদ সদস্য, এতগুলো অফিসার সবাই মিলে যেটা নিয়ে কাজ করলো, তাদের কারও কোনো জ্ঞান বুদ্ধি নেই, জ্ঞান বুদ্ধি ওই এক দুই জনেরই?’

সংসদ পরিচালনার বিষয়েও রায়ে ভুল কথা বলা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান প্রধান বিচারপতি বলেছেন, পার্লামেন্ট কতদিন চলবে, কী চলবে সেটা মন্ত্রিসভা ঠিক করে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি। তিন বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ ভুল। কেবিনেটে আমরা পার্লামেন্টে কত দিন চলবে, কী চলবে তা নিয়ে কখনও আলোচনা করি না। আসলেপার্লামেন্টের প্র্যাকটিস সম্পর্কে যার এতটুকু সামান্য ধারণা থাকে, সে এ কথা লিখতে পারেন না যে কেবিনেট সব সিদ্ধান্ত নেয়।

সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী মাননীয় স্পিকারের নেতৃত্বে কার্যউপদেষ্টা কমিটিতেই এই সিদ্ধান্ত হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সব দলের সদস্যরাই এই কমিটির সদস্য।

‘ওনার লেখা রায়ে অনেক কিছু আছে, অনেক কন্ট্রাডিকশন আছে। আমি পড়ে পড়ে অস্বাভাবিক লাগছে, নোট নিচ্ছি, আল্লাহর রহমতে পার্লামেন্টে আমরা এটা বলতে পারব।’

‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কেন চাইছেন?’

বিচারক অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেয়ার বিধান অবৈধ ঘোষণার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের কোনো কোনো অনুচ্ছেদ যেটা মূল সংবিধানে ছিল সেটা ওনার পছন্দ না। পছন্দ কোনটা? যেটা জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে… মার্শাল ল অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে তিনি যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করেছে, সেটা ওনার পছন্দ। কিন্তু সংসদ দ্বারা গণপরিষদ যে সংবিধান তৈরি করে দিয়েছে, সে ধারা ওনার পছন্দ না। সেখানে ওনি চাচ্ছেন মার্শাল ল যেটা করে গেছে, সেটা।’

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর জোট সরকারের আমলে গঠন করা বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রধা বিচারপতি জয়নাল আবেদীনকে প্রধান বিচারপতি বাঁচানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। অবসরে যাওয়া এই বিচারকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত না করতে দুদকে চিঠি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।

এই চিঠির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করবে, তদন্তে যদি দোষী হতো, আদালতেই তো বিচার চাইতে যেত। আদালতে বিচার চাইতে গেলে না হয় তিনি কিছু বলতে পারতেন। কিন্তু তদন্তেই করা যাবে না, এই কথাটা প্রধান বিচারপতি হয়ে কীভাবে বলেন? তার মানে একজন দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দেয়া, দুর্নীতবাজকে রক্ষা করা তো প্রধান বিচারপতির কাজ নয়। এটা তো সম্পূর্ণ সংবিধানকে অবহেলা করা, সংবিধানকে লংঘন করা।’

‘তার বিচার করা যাবে না কেন? তিনি অনেক রায় দিয়েছেন, সে জন্য। তো রায় দিলেই তার বিচার করা যাবে না, এটা আবার কোন ধরনের কথা। এটা কীভাবে হয়?’

‘তিনি এই চিঠি লিখলেন কীভাবে?’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার মানে সুপ্রিম জুডিয়িশাল কাউন্সিল হলে কোনো বিচার হবে না।’

জোট সরকারের আমলে সনদ জালকারী, কূটনৈতিক মিশনের দেয়ালে প্রস্রাব করা ব্যক্তিকে বিচারক করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোর্টের যে সেংটিটি যারা ধ্বংস করেছে, তাদের সবাইকে রক্ষা করার জন্য কি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল উনি চাচ্ছেন?’

‘ওনি কি ফ্লাইওভার দিয়ে চলেন না?’

রায়ের পর্যবেক্ষণে উন্নয়ন নিয়ে করা বিরূপ মন্তব্যেরও জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কারও কারও বক্তব্যটা কী? কয়টা ফ্লাইওভার আর রাস্তা হলে উন্নয়ন হলো না। কিন্তু আজকে যে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, যেখানে ৪৭ ভাগ ছিল সেটা ২২ ভাগে নামিয়ে এনেছি, আজকে মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, আজকে দেশের মানুষ দু বেলা পেট ভরে খাবার পাচ্ছে, আজকে দেশের মানুষ থাকার মত ঘর পাচ্ছে, রোগের চিকিৎসা পাচ্ছে, মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে, গ্রামের মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে, ৮০ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে, শতভাগ ছেলে মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। এগুলো কিছুই উন্নয়ন ওনার চোখে পড়ল না?’।

প্রধান বিচারপতি ফ্লাইওভার আর রাস্তা দিয়ে চলেন কি না সেই প্রশ্নও রাখেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আজকে বন্যা এসেছে, আমাদের আগে থেকে প্রস্তুতি বন্যা মোকাবেলা করার। একটা মানুষও যেন না খেয়ে থাকে, আমরা তার সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আমরা ক্ষমতায় আছি বলে এটা করতে পেরেছি। এটা নাকি উন্নয়ন না, তাহলে উন্নয়নটা কীসের। সংবিধান লংঘন করে ক্ষমতায় আসলে সেটা উন্নয়ন হবে? সেটা হবে না বাংলাদেশে।’

 ‘অন্য বিচারকরা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারেননি’

সাত বিচারকের আপিল বেঞ্চে বিচার হলেও প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্য কেউ স্বাধীনভাবে মত দিতে পেরেছেন বলে মনে করেন না প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগের প্রত্যেকটা জজ সাহেব কতটা স্বাধীন মতামত দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন আমি জানি না, সে সুযোগটা বোধহয় প্রধান বিচারপতি তাদেরকে দেন নাই।’

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হলে বিচার হবে

সংবিধানের বাইরে গিয়ে কেউ ক্ষমতা দখল করতে চাইলে পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে যা আছে, কেউ যদি ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে অবৈধভাবে, তাহলে তার বিচার হবে। আর জনগণের বিচারই বড় বিচার। সেটাও চিন্তা করতে আমি বলব।’