কুয়াকাটায় ধানের ফলন কম হলেও দামে খুশি কৃষকরা।

0
42

এম জাকির হোসাইন, কুয়াকাটা প্রতিনিধি।।

অগ্রহায়ণ মাসের বিদায়ের পালা। চলছে ধান কাটার ভরা মৌসুম। ইতোমধ্যে কৃষকের শুরু হয়েছে ফসল তোলার ব্যস্ততা। ঘটা করে না হলেও অভাবী কৃষকের ঘরে রান্না করা হয় নতুন চালের ভাত। নতুন ভাতের ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে সবুজ শ্যামল পাড়া-গাঁয়ের সকল মানুষ। তবে হরেক রকম পিঠা পায়েসের আয়োজন তেমন আর চোখে পড়ে না। ছোট ছোট বাচ্ছাদের আনন্দ-উল্লাসে সরব হয়ে ওঠা কৃষক পল্লী যেন অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। গত বছরের তুলনায় ফলন কম হওয়ায় আনন্দ নেই কৃষকদের মনে। ধানের বাজার দর ভালো থাকায় ক্ষতি পুষিয়ে ওাঠা সম্ভব বলে মত প্রকাশ করেন কুয়াকাটার কৃষকরা।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লতাচাপলী ইউনিয়নের কুয়াকাটা, আলীপুর, আজিমপুর ও খাজুরা এ ৪টি ব্লকে মোট ৪ হাজার ৭শ ৭৫ হেক্টর জমি ধান চাষের আওতায় আনা হয়। এ বছর আবাদি জমিতে বিআর-২৩, বিরি-২৭, বিরি-৩০, বিরি-৪৯, বিরি-৫২, আমন, স্বর্ণ মুশুরি, গুটি স্বর্ণা, কালি জিরা, চিনি গুড়া ও বিন্নি ধান চাষ করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিরি ৪৯ ও বিরি ৫২ প্রত্যাশার চেয়ে ফলন অনেক কম। এ অবস্থা লক্ষ্য করা গেছে ইউনিয়নের খাজুরা, মেলাপাড়া, ফাঁসিপাড়া, আলীপুর, দিয়ার আমখোলা, তাহেরপুর, মিশ্রিপাড়া, আজিমপুর এলাকায়। গত বছর বিঘা প্রতি স্বর্ণা ও গুটি স্বর্ণার ফলন এসেছিলো ১৫-১৮ মণ, এবছর তা হ্রাস পেয়ে ৯-১১ মণে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বিরি-৪৯ ধানের ফলন ছিলো ১৮-২০, এবছর ফলন এসেছে ১৩-১৫ মণ।

বাঘের হাট ও খুলনা থেকে এ অঞ্চলে এসেছে শ্রমিক কৃষাণ। তাদের দলে রয়েছে ২০ থেকে ৩০ জন শ্রমিক। প্রতিবছর এ মৌসুমে তারা দলবদ্ধভাবে ধান কাটতে চলে আসেন। বিনিময়ে তারা মালিকের কাছ থেকে পাচ্ছেন পারিশ্রমিক হিসেবে ধান কিংবা টাকা। উপকূল জুড়ে চলছে ধান কাটা, মাড়াই ও বাজারজাতকরণ কাজ। ধানের ক্ষেত, খইলান ও বাড়ির আঙ্গিনায় কৃষকরা পার করছেন ব্যস্ত সময়। এছাড়া ধানের বাজার দরও পাচ্ছেন প্রত্যাশিত হারে।

গত বছরে প্রতি মণ স্বর্ণা জাতের ধানের সর্বোচ্চ দর ছিলো ৭০০-৮২০ টাকা। এ বছর দর বেড়ে প্রতি মণ ৯০০-১০০০ টাকা। গত বছর বিরি ৪৯ প্রতি মণ ধানের দর ছিলো ৯৮০-১০০০ টাকা। চলতি বছরে তা বেড়ে ৯৫০-১১০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলন কম এলেও বাজার দর ভালো পাওয়ায় চাষীদের শুকনো মুখে ফুটেছে মৃদু হাসি।

কুয়াকাটার দিয়ার আমখোলায় ধানের ক্ষেত ঘুরে দেখার এক পর্যায়ে সাক্ষাত হয় কৃষক মো. হানিফ মুন্সির সাথে। তিনি বলেন, গত বছর মোর ১ কানি (২.৬৬ একর) জমিতে গুটি স্বর্ণা চাষ করছালাম। হ্যাতে মোট ১২০ মন ধান পাইলহাম (পেয়েছিলাম)। কিন্তু এই বছর হেই ফলন আইছে ৮০/৮৫ মণ। ট্রাক্টর, কাউমলা ও সার-কীটনাশকের খরচ বাদ দিয়া সামান্য টাহা আতে (হাতে) থাকতে পারে। এই টাহা দিয়া মোর সোংসার চালামু ক্যামনে হেই চিন্তায় বাঁচি না।

কলাপাড়া উপজেলা উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা অজয় মল্লিক সাক্ষাতকালে বলেন, গত বছরের ন্যায় আমরা এ অঞ্চলের কৃষকদের কৃষি কাজে সব রকমের টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছি। বিশেষ করে আবাদের সময় কুয়াকাটার মনির ভূঁইয়া ও ফরিদ উদ্দিনের জমিতে ‘লাইন লগো’ (দশ লাইন পরে এক লাইন ফাঁকা) ও পার্তিং (ক্ষতিকর পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। তাছাড়া মাজরা পোকার হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে ‘আলোর ফাঁদ’ নামে বিশেষ কৌশল শেখানো হয়েছে কৃষকদের। এ বছর আমাদের অফিস থেকে ৭০% ভর্তুকি দিয়ে কৃষককে ৮টি ‘রিপার মেশিন’ (ধান কাটার যন্ত্র) প্রদান করা হয়েছে। ধান কাটার এ মেশিনটি ১লিটার প্যাট্রোলে এক থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে ১ একর ধান কাটতে সক্ষম।’

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ধানের ফলন সম্পর্কে বলেন, এবছর বিরি ৪৯, কোনো কোনো জায়গায় গুটি স্বর্ণার ফলন খারাপ হয়েছে। এর কারণ হিসেবে ধানের ‘ফ্লাওয়ারিং পিরিয়ডে’ (ধান গজানোর সময়) নি¤œচাপের কারণে বৈরী আবহাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের উপর কারো হাত নেই। তবে আমরা কৃষকদের সব রকমের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।