খালেদার দুর্নীতি মামলার রায় ৮ ফেব্রুয়ারি

0
56

বিচার শুরুর প্রায় চার বছর পর রায়ের তারিখ ঘোষণা হলো বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা এক দুর্নীতি মামলায়। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রায় দেবেন ঢাকার বিশেষ আদালত-৫ এর বিচারক আখতারুজ্জামান।

যে আইনে দুর্নীতির মামলাটির বিচার হচ্ছে, তার সর্বোচ্চ সাজা নির্ধারিত আছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর রাষ্ট্রপক্ষ এই সাজাই দাবি করেছে বিচারকের কাছে।

দীর্ঘ শুনানি ও যুক্তি উপস্থাপন শেষে বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার বিশেষ আদালত-৫ এর বিচারক আখতারুজ্জামান এই সিদ্ধান্ত জানান।

মোট ২৩৬ কাযর্দিবসে মামলাটির বিচারকাজ শেষ হলো। শেষ দিন দুই আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষে রাষ্ট্রপক্ষ তথা দুদকের আইনজীবী এবং সবশেষে খালেদা জিয়ার পক্ষে বক্তব্য দেন দুই আইনজীবী।

মামলায় মোট ১৬ দিন যুক্ততর্ক উপস্থান করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে এক দিন, খালেদা জিয়ার পক্ষে ১০ দিন এবং কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে পাঁচ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।

গত ১৯ ডিসেম্বর এই মামলায় ‍যুক্তি উপস্থাপন করে দুদকের আইনজীবী খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করেন। এরপর ২০, ২১, ২৬, ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর এবং ৩, ৪, ১০, ১১ এবং ১৬ জানুয়ারি খালেদার পক্ষে যুক্ত উপস্থাপন করেন তার আইনজীবীরা।

আদালত রায়ের তারিখ ঘোষণার পর সাংবাদিকদের দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘আমরা অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করেছি। আমাদের বিশ্বাস, ছয় আসামিই সর্বোচ্চ সাজা পাবেন।’

দুদকের আইনজীবী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে মামলার এফআইআর ও অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে গিয়েছিলেন। উচ্চ আদালত তাদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। এখানেও মামলা প্রমাণ করতে পেরেছি। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের দিন ঘোষণা করেছেন। রায় আমাদের পক্ষে আসবে।’

তবে খালেদা জিয়ার প্রধান আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, ‘এটি একটি অসার মামলা। খালেদা জিয়ার খালাস পাবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরেুদ্ধে করা বহুল আলোচিত মামলাটি করা হয়েছিল ২০০৮ সালের জুলাইয়ে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে বিএনপি নেত্রী ছাড়াও আসামি করা হয় তার ছেলে তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে।

আসামিদের মধ্যে তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকেই লন্ডনে অবস্থান করছেন। তাকে আদালতে হাজির হতে আদেশ দেয়া হলেও তিনি আসেননি। তবে অর্থপাচারের অন্য একটি মামলায় তার সাত বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ কোটি টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান শুরু থেকেই পলাতক।

একই আদালতে চলা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার যুক্তি উপস্থাপনের সময়ও বেঁধে দিয়েছেন বিচারক আখতারুজ্জামান। আগামী ৩০, ৩১ জানুয়ারি এবং ১ ফেব্রুয়ারি যুক্তি ‍উপস্থাপন করবে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ।

শেষ দিনের শুনানিতে রায়ের তারিখ ঘোষণা নিয়ে হৈ চৈ

শুরু থেকেই এই মামলার শুনানিতে নিয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের সঙ্গে ‍দুদকের আইনজীবীদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে নানা সময়। শুনানির শেষ দিনেও একই ঘটনা ঘটেছে।

শুনানির শেষ খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা সময় চাইলে দুদকের আইনজীবী রায়ের তারিখ দেয়ার আহ্বান জানান। এ সময় কিছুক্ষণ হৈ চৈ করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।

শেষ দিন দুই আসামির যুক্তি উপস্থাপনের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তাদের সমাপনী বক্তব্য রাখেন।

বেলা ১১টা ৭ মিনিটে বিচারক আদালতে আসনগ্রহণ করেন। বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হন। যুক্তি উপস্থাপনের শেষ সময়ে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ ও খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের পক্ষে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আরও সময় প্রার্থনা করলে বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল।

আসামিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষে মিনিট দশেক আইনি যুক্তি দেন দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। তিনি জানান, এই মামলার এফআইআর , অভিযোগপত্র এবং সাক্ষ্যগ্রহণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়ার আইজীবীরা। কিন্তু হাইকোর্ট সব আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। তার মানে উচ্চ আদালতেও মামলাটি প্রমাণ হয়েছে।

একই সঙ্গে দুর্নীতির বিভিন্ন মামলায় উচ্চ আদালতের রায়ের উদাহরণ দিয়ে খালেদা জিয়াসহ সব আসামির সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন দুদকের আইনজীবী কাজল।

এরপর খালেদা জিয়ার আইনজীবী সোয়া তিনটার দিকে রেজ্জাক খান আবার কথা বলতে শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আজ তো অনেক সময় হয়ে গেছে, ওনি (খালেদা জিয়া) আগামী দিন সময় চান।’

এ সময় দুদকের আইনজীবী কাজল আবার উঠে বলেন, ‘আপনারা এই মামলায় আইনি যুক্তিতর্ক আগেই দিয়েছেন। আমি দেইনি বলে আজ দিলাম।’

বিচারককে কাজল বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আপনি রায়ের দিক ঘোষণা করেন।’

তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা হৈ চৈ করেন। এ সময় সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদিন এক মিনিট সময় চেয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের পিপি প্রত্যেকটা বিষয়েই কথা বলেন। তিনি আদালতকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন।’

এরপর রেজ্জাক খান বলেন, ‘মাননীয় আদালত, এই মামলার সারবত্তা নেই। মামলায় টাকার কোনো উৎস্য নেই। রাষ্ট্রপক্ষ নথিপত্র দিতে পারে নাই।’

‘উচ্চ আদালত থেকে এই মামলার বিষয়ে কোনো ডিসিশন দেয়নি। তারা বলেছে, এই মামলার ম্যাটেরিয়াল এবং এভিডেন্স অনুযায়ী বিচার হবে। আমরা যতবার উচ্চ আদালতে গেছি, উচ্চ আদালত ততবারই এই কথা বলেছে।’

সব শেষে বেলা সোয়া তিনটার দিকে বিচারক আখতারুজ্জামান রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করেন।

দীর্ঘ আইনি লড়াই

মামলা করার দুই বছরের কিছু বেশি সময় পর ২০১০ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়াসহ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন দুদকের উপপরিচালক হারুন-অর-রশীদ।

এরও সাড়ে তিন বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর আদেন দেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

এই মামলাটির বৈধতা এবং বিচারিক আদালতের বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন নিয়ে দেড়শরও বেশি বার উচ্চ আদালতে আপিল করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। কিন্তু প্রতিবারই উচ্চ আদালত সে আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছে। সেই আবেদনের বিরুদ্ধেও আপিল হয়েছে অসংখ্যবার।

এই মামলায় দুদকের পক্ষ থেকে মোট ৩২ জনকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আবার খালেদা জিয়ার আবেদনে দুইবার বিচারক বদল হয়েছে এই মামলায়।

এর মধ্যে শুনানির শেষ দিকে যুক্তি উপস্থাপন করা হয় মোট ১৬ দিন। এর মধ্যে একদিন যুক্তি দিয়েছেন দুদকের আইনজীবীরা। আর খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তি দেয়া হয়েছে ১০ কার্যদিবস। অন্য দুই আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে যুক্তি দেয়া হয়েছে পাঁচ কর্মদিবস।

অপর তিন আসামি পলাতক থাকায় তাদের পক্ষ কোনো আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ ছিল না। দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল জানান, যেসব মামলার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, সেসব মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ পলাতকদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেয়। কিন্তু এই মামলায় সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তাই এখানে পলাতক তিন আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেয়নি সরকার।