গলাচিপায় নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রাইভেট,কোচিং-বাণিজ্য চলছেই

0
430

রিপন বিশ্বাস,পটুয়াখালী।।

প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিং-বাণিজ্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে এ সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামাঞ্চলের স্কুলপড়ূয়া একজন শিক্ষার্থীকে একাধিক বিষয় শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে হয় আর শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীকে করতে হয় প্রাইভেট ও কোচিং। তবে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই প্রাইভেট ও কোচিং-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের তাঁদের কাছে পড়তে বাধ্য করেন কিংবা চাপ দেন। এতে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের স্বাভাবিক সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি পাঠদান-পাঠগ্রহণেও ধারাবাহিকতার বিঘœ ঘটছে।
এ বিষয়ে একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রেণিকক্ষে ভালো পড়ালেখা হয় না।

তাই কোচিং সেন্টার কিংবা শ্রেণী শিক্ষকদের বাড়িতে ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। সঙ্গত কারণেই জনমনে প্রশ্ন জাগে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কি শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২ প্রত্যাহার করেছে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১২ সালে কোচিং-বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে। নীতিমালার অনুচ্ছেদ ৭-এ উল্লেখ আছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি কোচিং-বাণিজ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান প্রয়োজনীয় প্রচারণা ও অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। অনুচ্ছেদ ১৪-এর ‘ক’ উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তাঁর এমপিও স্থগিত, বাতিল, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্ত ইত্যাদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই অনুচ্ছেদের ‘খ’ উপ-অনুচ্ছেদে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও-বিহীন শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতন-ভাতাদি স্থগিতসহ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একই ধরনের শাস্তি প্রদানের কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে অনুচ্ছেদের ‘ঙ’ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫ প্রয়োগ করা হবে।

উল্লিখিত বিধিসমূহ সদয় জ্ঞাতার্থে ও কাযার্থে শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ ২৪টি স্তরে প্রেরণ করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নীতিমালা বাস্তবায়নে। এ নীতিমালা কিছুদিন হইচই ফেলেছিল। শিক্ষা ব্যবসায়ীরা কিছুদিন ঘাপটি মেরে ছিল। এরপর আর তেমনভাবে নিয়ম পালিত হচ্ছে না। সব আগের মতোই চলছে। অথচ সরকার নির্বিকার। জানা গেছে, কোচিং-ব্যবসায়ী শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তা আমলে নিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে কোচিং-বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে পরস্পরকে ঘায়েল করার তৎপরতা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অনেক শিক্ষক নিজে কোচিং-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থেকেও অন্য শিক্ষকদের ‘কোচিংবাজ’ আখ্যায়িত করে তাঁদের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষা প্রশাসনও এসব অভিযোগ খতিয়ে না দেখে অভিযোগকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, আইনের প্রয়োগ না হলে আইন করার দরকার কী? এ কি শুধুই লোক দেখানো? গত ছয় বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অর্জন অনেক।

শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালাটিও দেশের বিবেকবান ও সচেতন মহলকে আলোড়িত করেছিল। ভুক্তভোগীরা ভেবেছিলেন এবার অন্তত শিক্ষক নামধারী কিছুসংখ্যক শিক্ষা-ব্যবসায়ীর লাগাম ধরা যাবে।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা করা হয়েছে। অনেক শিক্ষকের এমপিও বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যেসব শিক্ষক অধিক হারে কোচিং করাতেন, তাঁরা কোচিং করানো অনেকটা বন্ধ করেছেন। সবকিছুই এক দিনে সম্ভব নয়। কোচিং বন্ধে অভিভাবকদেরও ভূমিকা থাকতে হবে।’
শিক্ষামন্ত্রীর সুরে সুর মিলিয়ে বলতে হয়, কোচিং বন্ধে সরকারের যেমন কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মনোজগতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

শিক্ষকদের হতে হবে আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল। শিক্ষকেরা যদি শ্রেণিকক্ষে নিজেদের উজাড় করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান, তাহলে আর কোচিংয়ের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে না। তা ছাড়া সামর্থ্য বানেরা যেভাবেই হোক সন্তানের টিউশনির টাকা জোগাড় করেন। কিন্তু যাঁদের সামর্থ্য নেই, তাঁরা সন্তানদের টিউশনির টাকা জোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছেন। তাই আমাদের উচিত হবে বর্তমান নীতিমালা মেনে চলা এবং ভবিষ্যতে আরও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা।