জাল বিএড সনদে প্রধান শিক্ষক এমপিও ভুক্তির আবেদন *শিক্ষক মহলে তোলপাড়

0
207

বরিশাল অফিস ॥

জালজালিয়াতির মাধ্যমে বিএড ডিগ্রি সনদ বের করে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভের পর এমপিও ভুক্তির জন্য অনলাইনে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে জেলা শিক্ষা অফিসে যাবতীয় কাগজপত্র প্রেরণ করেছিলেন কেএম নাসির উদ্দিন সবুজ খান নামের এক প্রধান শিক্ষক।

জেলা শিক্ষা অফিসারের যাচাই বাছাইয়ে উপর্যুক্ত বিষয়ে বর্ণিত শিক্ষকের বিএড ডিগ্রি সঠিক নয়, ভুয়া মর্মে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবরে অনুলিপি প্রেরণ করা হয় (যার স্মারক নং জেশিঅ/পটু/৭৩/৪ তারিখ: ২৩ জানুয়ারি ২০১৭)। এ সংক্রান্ত সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর থমকে যায় নাসির উদ্দিনের এমপিওভুক্তি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পূর্বের জমা দেয়া কাগজপত্র গোপন রেখে অতিসম্প্রতি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে জেলা শিক্ষা অফিসের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজসে ২৪ মাস পর ওই প্রধানশিক্ষকের এমপিও ভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি সর্বত্র ছড়িয়ে পরলে শিক্ষক ও সুশীল সমাজের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট উধর্ক্ষতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন শিক্ষক সমাজের নেতৃবৃন্দরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল বিভাগীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কেএম নাসির উদ্দিন সবুজ খান ২০১৬ সালের ২ জানুয়ারি বিএড ডিগ্রির ভুয়া সনদ দিয়ে প্রধানশিক্ষক পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি (প্রধানশিক্ষক) অনলাইনে এমপিওভুক্তির জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে জেলা শিক্ষা অফিসে যাবতীয় কাগজপত্র প্রেরণ করেন। ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি জেলা শিক্ষা অফিসার রুহুল আমীন খান উপর্যুক্ত বিষয়ে বর্ণিত শিক্ষকের বি এড ডিগ্রি সঠিক নয়, ভুয়া মর্মে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের উধর্ক্ষতন কর্মকর্তাদের বরাবরে অনুলিপি প্রেরণ করেন।

ফলে প্রধানশিক্ষক নাসির উদ্দিনের এমপিও ভুক্তি থমকে যায়। সূত্রে আরও জানা গেছে, ওইসব কাগজপত্র গোপন রেখে অতিসম্প্রতি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পটুয়াখালী জেলা শিক্ষা অফিসের হেড ক্লার্ক সুলতান আহমেদের মাধ্যমে বর্তমান জেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলমকে ভুল বুঝিয়ে ২৪ মাস পরে এমপিওভুক্তির সুপারিশ করা হয়।

সূত্রমতে, জেলা শিক্ষা অফিসার রুহুল আমীন খান কর্তৃক উপ-পরিচালক বরাবরে প্রেরিত চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারির জেশিঅ/৭৩ নং স্মারকের প্রতিবেদনে কেএম নাসির উদ্দিন বাউফল উপজেলার বজলুর রহমান ফাউন্ডেশন গার্লস সেমিনারির সহকারী শিক্ষক থাকাকালিন ২০০৬ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পটুয়াখালীর বেসরকারী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হন (যার রোল নং-৬১২৬৭১)। এরপর ২০০৭ ও ২০০৮ সালে আরও দুইবার একই বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে বিএড প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে নাসির উদ্দিন অকৃতকার্য হন। দুইবছর পর ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষে পুনরায় বিএড প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির কাছে নাসির উদ্দিন এক বছরের ছুটির আবেদন করেন। ম্যানেজিং কমিটি ২০১০ সালের জুন থেকে ২০১১ সালের মে মাস পর্যন্ত এক বছরের ছুটি অনুমোদন করেন। পরে আরও ছয় মাস ছুটি মঞ্জুর করা হলেও বিএড প্রশিক্ষণে নাসির উদ্দিন উত্তীর্ণ হতে পারেননি। কিছুদিন পর সাভারের গণকবাড়ির দারুল ইহসান বিশ^বিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালের বিএড প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ হওয়ার একটি সনদপত্র বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয় কেএম নাসির উদ্দিন। প্রশিক্ষণের জন্য ছুটির সাল ও পাসের সনদ নিয়ে ওই সময় বির্তকের সৃষ্টি হয়।

এরইমধ্যে কেএম নাসির উদ্দিন ওই সনদ দিয়ে ২০১৬ সালের ২ জানুয়ারি বাউফলের সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিদ্যাপীঠ নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। পরবর্তীতে অনলাইনে এমপিওভুক্তির জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে জেলা শিক্ষা অফিসে যাবতীয় কাগজপত্র প্রেরণ করা হয়। সূত্রগুলো আরও জানিয়েছেন, কেএম নাসির উদ্দিনের বিএড প্রশিক্ষণের ভুয়া সনদ সম্পর্কে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাধিক ব্যক্তিরা জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে প্রমানাদিসহ অভিযোগ দাখিল করেছেন। সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরই এ কাজগুলো অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে করলেও অতিসম্প্রতি পুরো ঘটনাটি ফাঁস হয়ে গেলে বরিশালের শিক্ষক সমাজের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দরা অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট উধর্ক্ষতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত প্রধানশিক্ষক কেএম নাসির উদ্দিন সবুজ খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উল্লেখিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিএড ডিগ্রির সনদপত্র সঠিক। ২০০৬, ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএড প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হওয়ার পরেও ২০০৮ সালেই কিভাবে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাসের সনদ লাভ করলেন এমন প্রশ্নের কোন কেএম নাসির উদ্দিন কোন সদূত্তর দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে বরিশাল বিভাগীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ডিডি ড. মুস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।