দখল-বর্জনের নির্বাচন

0
25

স্টাফ রিপোর্টার॥ বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি, বিশৃঙ্খলা, এজেন্টদের বের করে দেয়া, ব্যালট ছিনতাই ও জালভোট প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৫ মেয়র প্রার্থী ভোট বর্জন করে নির্বাচন দেয়ার পুনরায় দাবি তুলেছেন নির্বাচনে অংশ নেয়া ৫ মেয়র প্রার্থী। গতকাল দুপুর ১২ টার দিকে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী মাওলানা ওবাইদুর রহমান ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী, সিপিবির মেয়র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ও জাতীয় পার্টির (বহিষ্কৃত) মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

 

যদিও এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে তা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। নির্বাচন কমিশনার মাহাবুব তালুকদার বলেছেন-‘আমি শুনেছি বরিশালে ভোটকেন্দ্র দখল হয়েছে। সেখানে একজন মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে খারাপ আচরণও করা হয়েছে। বিএনপির প্রার্থী ভোট বর্জনও করেছে। আমরা জেনেছি বরিশালে খুব বাজে অবস্থা। আমরা তদন্ত করে দেখছি। এসব বিষয় নিয়ে আমরা কমিশনে আলাপ-আলোচনা করেছি।

 

কমিশন সভায় যে সিদ্ধান্ত হয়, তা পরে জানানো হবে।’ সোমবার দুপুরে আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা এই নির্বাচন কমিশনার এসব কথা বলেন। ভোটের দিনে বরিশাল নগরীর সরেজমিন পরিদর্শন করে বিস্তারিত তথ্য হচ্ছে: দীর্ঘ এক মাস শেষে প্রচার-প্রচারণা শেষে গতকাল সকাল আটটায় শুরু হয় ভোটগ্রহণ। শুরুতেই সরকারি বরিশাল কলেজে ভোট প্রদান করেন আ’লীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।

এসময় তিনি ভোটে জিতবেন বলে শতভাগ আশাপ্রকাশ করে সবাইকে নিয়ে আগামীর বরিশাল গড়বেন বলে গণমাধ্যমকে জানান। সকালে ভোট শুরু হওয়ার পরপরই শহরের কেন্দ্রস্থলে অশ্বিনীকুমার হলে অনেক ভোটার ছিল। ভোট সুষ্ঠুভাবেই চলছিল এবং যথেষ্ট ভিড় ছিল। প্রথম কিছুক্ষণ ভালোভাবে ভোট প্রদান চললেও আস্তে আস্তে পরিস্থিতি ভিন্নরূপ ধারন করে। শুরু হয় বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোট প্রদান। এছাড়া আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগ সহ বিপুল সংখ্যক বহিরাগতদের মহড়া চোখে পড়ে। বেলা বৃদ্ধির সাথে সাথে অসংখ্য কেন্দ্র থেকে আরো অনিয়মের অভিযোগ আসতে থাকে। অবশেষে ১৫টি কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। কিছু কেন্দ্রের ভোট স্থগিত ও বাতিল করা হয়। সকাল ৮ টা ৪০ মিনিটে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ১নং ওয়ার্ডের সৈয়দা মজিদুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান করেন।

 

ভোটার নাম্বার না জানার কারনে সরোয়ারের ভোট প্রদানে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় ভোটকেন্দ্রের বাইরে গৌরনদী উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুন্নাহার মেরীর নেতৃত্বে হট্টগোল শুরু করে আ’লীগের কর্মীরা। নৌকা প্রতীকের ব্যাজধারী অনেকেই ‘জয় বাংলা’, ‘সরোয়ারকে বাইর কর’ স্লোগান দিতে থাকেন। ২০-২৫ জন ভোটকেন্দ্রে ঢোকার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ ভোটারদের দীর্ঘ সারি থাকলেও তারা ভেতর ঢুকতে পারছিলেন না। এ সময় মজিবর রহমান সরোয়ার কেন্দ্রে আটকা পড়েন। অতিরিক্ত পুলিশ এসে বিএনপি সরোয়ারকে বের করে আনেন। বাইরে বেরোলে অপেক্ষারত নৌকা প্রতীকের ব্যাজধারী লোকজন মজিবর রহমান সরোয়ার ও বিএনপির নেতাকর্মীদের ঘিরে ধরেন। এসময় (সকাল পৌনে নয়টার দিকে) মজিবর রহমান সরোয়ার সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, ‘অর্ধশতাধিক কেন্দ্র থেকে বিএনপি পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

 

এভাবে চলতে থাকলে কোনোভাবেই সুষ্ঠু ভোট হবে না’। এভাবে চলতে থাকলে তিনি ভোট বর্জন করতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেন। পরে পুলিশ সদস্যরা মজিবর রহমান সরোয়ারকে গাড়িতে তুলে কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। এরপরবর্তী সময়ে সৈয়দা মজিদুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নারী ও পুরুষদের দুটিকেন্দ্রে সরকারি দলের স্থানীয় ও বহিরাগত শতাধিক ব্যক্তি কেন্দ্র দখল করে জোরপূর্বক ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে নৌকা প্রতীকে গণহারে সিল মারে। বেলা ১১টার দিকে পুরুষ কেন্দ্রের চার নম্বর বুথে টেবিলের ওপর মেয়র পদের ব্যালট বইয়ের মুড়িটি ভাঁজ করা অবস্থায় পড়ে ছিল। প্রতিটি ব্যালটে নৌকা প্রতীকের ওপর সিল মারা। ওই বুথের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার তৌহিদা খানম বলেন, একদল লোক এসে জোর করে এই ব্যালট বইয়ে সিল মেরে গেছে।

 

সঙ্গে সিল-প্যাডও নিয়ে গেছে। একপর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে কেন্দ্রের ভোট কার্যক্রম স্থগিত করে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার পাশাপাশি গৃহীত ভোটও বাতিল করেন। এ কেন্দ্রটির নম্বর ৪। মোট ভোটার ছিল ২৪ শ ৭ জন। বুথ ছিল সাতটি। সরেজমিনে আরো দেখা যায়, দুই একটি কেন্দ্রছাড়া সবগুলোতেই আওয়ামী লীগের মেয়র বা কাউন্সিলরের কর্মীদেরই দেখা গেছে। এমনকি কেন্দ্রের ভেতরেও শুধুমাত্র নৌকার ব্যাজ লাগানো কর্মীদেরই দেখা গেছে। অনেক কেন্দ্রে বিরোধী পোলিং এজেন্টদের দেখা যায়নি। নগরের ৩০ নং ওয়ার্ডের কলাডেমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র ভোট শুরুও কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়র প্রার্থীর ব্যালট উধাও হয়ে যায়। নৌকা প্রতীকের ব্যাজ পরা লোকেরা এসে ব্যালট ছিনতাই করে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারে বাক্সভর্তি করে। এসময় নৌকার এজেন্টরাও নিজেরাই নৌকায় সিল মারতে থাকেন। কর্তব্যরত সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজন ভোটার মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর তিনটি ভোট দিবে। কিন্তু মেয়র প্রার্থীর ব্যালট শেষ।

কীভাবে শেষ হলো? জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের লোকজন এসে সব নিয়ে গেছে। এদিকে ইলেক্ট্রিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন বিসিসির অসংখ্য ভোটার। সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ কেন্দ্রে দেখা গেছে, ইভিএমে যখন কোন ভোটার তার বাটন পুশ করবেন, তখন সরকার দলীয় মেয়র ও কাউন্সিলরের কর্মীরা ভোটারদের বাটনে পুশ করতে না দিয়ে নিজেরাই বাটন চেপে ভোট দিচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, ভোট কেন্দ্রের ইভিএম’র ডিসপ্লেতে সব প্রতীক দেখানোর কথা থাকলেও শুধু নৌকা ও আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রতীক সেখানে দেখানো হচ্ছে। ফলে তারা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

 

বাইরে ভোটারের সারি লম্বা হতে থাকলেও ত্র“টি থাকায় ভোটগ্রহণ ঠিকভাবে হয়নি। এতে করে দীর্ঘসময় ধরে ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে। বেশকিছু কেন্দ্রে ভোটারদেরকে শিখিয়ে দেয়ার নামে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজেই নৌকার প্রতীকে ভোট দিয়ে ভোটারকে বলেছেন যে, আপনার ভোট হয়ে গেছে। ২০ নং ওয়ার্ডের বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের ৭৭ ও ৭৮ নং কেন্দ্রে এই ঘটনা দেখা যায়। ৭৭ নং কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন শোভা রানী মল্লিক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইভিএম মেশিন ডিস্টার্ব দিয়েছে। নৌকা ছাড়া অন্য মার্কা বুঝা যায়না, অস্পষ্ট। বুথে দায়িত্বরত ব্যক্তি শিখিয়ে দেয়ার নাম করে নিজেই নৌকা প্রতীকে ক্লিক করে বলেন যে ভোট দেয়া শেষ। এভাবে আরো কয়েকজন ভোটার এই ভোগান্তির কথা বলেন। একই ঘটনা ১২ নং ওয়ার্ডেও । এখানে দুইটি ভোটকেন্দ্রেও ইভিএমে ভোট নেয়া হয়। কিন্তু ভোট শুরুর কিছুক্ষণ পরই ইভিএমে ত্র“টি দেখা দেয়। ফলে ৫০ নং কিশোর মজলিস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি বুথে ভোটগ্রহণ দেরি হয় এবং ইভিএম বাদ দিয়ে ম্যানুয়ালি ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এরইমধ্যে বেলা ১১ টার দিকে বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল ছাত্রলীগ নেতাকর্মী দোতলার বুথে প্রবেশ করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন নীরব ভূমিকায়।

 

তারা ঢুকেই সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার কল্লোল কুমারের কাছ থেকে ব্যালট বই ছিনিয়ে নিয়ে কয়েকজন প্রকাশ্যে নৌকা ও ঠেলাগাড়িতে সিল মেরে বাক্সে ভরেন তবে ছাত্রীগের সভাপতি জসিম আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী সাদিক আব্দুল্লাহ পক্ষে নয় স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ঠেলাগাড়ীর পক্ষে ভোট দেয়ার একটি ভিডিওচিত্র সোস্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে যায়। জসিমের এমন চিত্র দেখে হতভম্ব হন স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মাহফুজুর রহমান সহ প্রশাসন এসে খোঁজখবর নেন। পরে কিছুক্ষণের জন্য ভোট স্থগিত করা হয়। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী কেএম শহীদুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, সরকারি দলের লোকজন ব্যালট ছিনতাই করে নৌকা ও ঠেলাগাড়িতে ভোট দিয়েছে। সুষ্ঠু ভোট হয়নি। তবে এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সামান্য অনিয়ম হলেও ভোট সুষ্ঠু হয়েছে।’

 

তবে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার কল্লোল কুমার বলেন, আমি ছিলাম অসহায়। যদিও ভোট কেন্দ্রে এবং বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন ছিল। কিন্তু তাদের ভুমিকা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। জেলা ছাত্রলীগের সম্পাদক আঃ রাজ্জাকের নেতৃত্বে একই ঘটনা ঘটে ফারিয়া কমিউনিটি সেন্টার ভোট কেন্দ্র ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে। তারা কেন্দ্রে প্রবেশ করে নৌকা ও ঠেলাগাড়ি (ছাবিত) প্রতীকের ব্যালটে সিল মারেন। উৎসাহ নিয়ে কাশিপুরের ইছাকাঠি কেন্দ্রে জীবনের প্রথম ভোট দিতে এসেছিলেন গৃহবধু শারমিন আক্তার।

 

ভোট কেন্দ্র থেকে ফিরে স্বামীকে জানালেন, কাকে কাউন্সিলর ভোট, আরা কাকে দিয়েছেন সংরক্ষিত কাউন্সিলরের ভোট। প্রশ্ন করলেন স্বামী, মেয়র ভোট কাকে দিলা? স্ত্রীর উত্তর, মেয়র ভোটতো দুপুরের পর। পোলিং অফিসার আমাকে বলল এই দুইটা ব্যালট এখন নিন, দুপুরের পর মেয়র ভোট দেবেন। শারমিনের কর্মজীবি স্বামী সুমন জানান, তিনি আর কেন্দ্রেই যাবেন না। ২নং ওয়ার্ডের ভোটার মোতালেব মিয়া বলেন, সকাল ৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন পৌনে নয়টা বাজে। লাইনের ২/১ জন ঢুকছে ১৫/২০ মিনিট পরপর। অথচ ভিতরে একদল যুবক ঢুকছে আর বের হচ্ছে। পুলিশও কিছু বলছে না। আর আমরা লাইনে দাঁড়িয়েই আছি। ৪ নং ওয়ার্ডে ৫০ ঊর্ধ এক ভদ্রলোক বলেন, এক ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে আছি। শেষ পর্যন্ত এলাকার ছোট এক ভাই বলল- দাদা বিকেলে আসেন।

 

এখন অন্য কাজ চলছে। অন্যদিকে, সকাল পৌনে ১০টার দিকে নেতাকর্মী নিয়ে সরকারি বালিকা বিদ্যালয় (সদর গার্লস) কেন্দ্র পরিদর্শনে যান বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন মেয়র ব্যালট বাদে শুধু অন্য দুটি ব্যালট দেয়া হচ্ছে। তিনি কেন্দ্রের ভিতরে গিয়ে দেখেন মেয়র ব্যালটে সিল মারছে আওয়ামী লীগের কর্মীরা । মনীষা এসময় বিষয়টি সরাসরি গণমাধ্যমে তুলে ধরেন। এ নিয়ে আ’লীগের পোলিং এজেন্টের সাথে তার বাকবিতন্ডার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের দুই কর্মী মনিষাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন । এসময় তিনি বাম হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আহত হন। এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম জানান- ‘আমি কোনও মন্তব্য করতে চাই না এই ব্যাপারে। তবে আপনাদের কাছে কোনও তথ্য থাকলে আমাদের দিন। আমরা ভোটকেন্দ্র বন্ধ করে দেবো।’ এদিকে কন্ট্রোল রুম থেকে মেজর রাজু বলেন- ‘আমরা এখন পর্যন্ত যে খবর পাচ্ছি, তাতে অধিকাংশ কেন্দ্রেই ঝামেলার কথা শুনতে পাচ্ছি।’ দুপুর ১২ টার দিকে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বরিশাল প্রেসসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন কওে নিজেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক চান, নগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুল হক, জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজ আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এসময় মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, গাজীপুর ও খুলনায় ভোটগ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হলেও বরিশালে ভোট শুরুই করা হয়নি। ৭০ থেকে ৮০টি কেন্দ্রে ভোট শুরু না হতেই ব্যালটে নৌকার সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। বিএনপি ও অন্য দলের কোনো প্রার্থীর এজেন্টদের ভোটকক্ষে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। নির্বাচনে প্রশাসনের ভূমিকা ন্যক্কারজনক। আমি চারবার সংসদ সদস্য ও একবার মেয়র ছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকারের আমলেই এমন নজিরবিহীন ভোট আমরা দেখিনি।

 

এমন প্রহসনের নির্বাচন না করে এমনিতেই ঘোষণা দিয়ে নিয়ে যেতে পারত সরকার। আজকে মানুষের মাঝে হতাশা সৃষ্টি করা হয়েছে যে দেশে কখনো আর সুষ্ঠু নির্বাচন হবেনা! তিনি বলেন, আমরা আগেই বলেছিলাম, এখানে প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় প্রার্থী, তাই সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনের আশ্বাসে আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। এরপরও হামলা-মামলা সত্বেও আমরা নির্বাচনে অংশ নিই। কিন্তু আমাদের আগের আশঙ্কাই আজ ঠিক হলো। এখানে পুলিশ আওয়ামী লীগের পক্ষপাতিত্ব করেছে। তারা ব্যালট ছিনতাই করে নৌকায় সিল মারতে সহায়তা করেছে। বহিরাগতদের দিয়ে ভোট কেড়ে নেয়া হয়েছে। সরোয়ার আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার অর্জন করেছিলাম। আজকে সবকিছুই ধ্বংস। নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস। তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে পারেনা। নিশ্চয় মানুষ জেগে উঠবে।

 

সংবাদ সম্মেলনে নৌকা প্রতীকে সিল মারা ১০ থেকে ১২টি ব্যালট সাংবাদিকদের দেখিয়ে সরোয়ার বলেন, সদর গার্লস স্কুল কেন্দ্রে এভাবে ব্যালটে নৌকার সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। তিনি ভোট প্রত্যাখ্যান করে এর প্রতিবাদে আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় ঘেরাও করার কর্মসূচি দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে আমার আন্দোলনেও যাবো। এরপর মিছিল নিয়ে তিনি নির্বাচন কার্যালয়ের দিকে রওনা দেন। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান মাহাবুব সদররোড দিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় তার কাছাকাছি দূরত্বে বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তীও নেতাকর্মী নিয়ে আসছিলেন। ‘প্রহসনের নির্বাচন মানি না মানব না’, ‘ভোট চুরির নির্বাচন মানি না মানব না’ এমন বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে তারা মিছিল করছিলেন।

প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানান, হঠাৎ করেই সিটি কলেজের গেট থেকে তাদের উদ্দেশ্য করে কয়েকজন যুবক ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এসময় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরাপারসন আহত হন। ইসলামী আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেন, নৌকার সমর্থকরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের ও বাসদের মিছিলের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় মনীষা গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বলেন, তিনি সদর গার্লস স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকে সিল মারতে দেখেন। প্রতিবাদ করলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এসময় তার বাম হাতে তিনি আঘাত পান। অভিযোগ জানানোর পরও এই কেন্দ্রে নির্বাচন এখনো চলে। এই কেন্দ্রের মতো সব কেন্দ্রেই নৌকায় সিল মারা হয়। এদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বরিশালে ভোট স্থগিত চেয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন।

এদিকে নগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জয়নাল আবেদীন ও এটি এম শহীদুল্লাহ কবিরের সমর্থকদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে প্রথমে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ নগরের ফজলুল হক অ্যাভিনিউ থেকে সদররোডে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টার ব্যবধানে বিজিবি ও র‌্যাব-পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পাশাপাশি নগরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের গারস্তান রোডে সৈয়দ আব্দুল মান্নান ডি.ডি এফ সিনিয়র ও হাফেজি মাদ্রাসায় এবং নগরের দক্ষিণ আলেকান্দার কিশোর মজলিস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইভিএম এ ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে তা নিয়ন্ত্রণে আসে। নগরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

 

সদ্য বিজয়ী কাউন্সিলর মজিবর রহমানের (ঘুড়ি প্রতীক) সমর্থকদের হামলায় ৫ জন আহত, একটি দোকান ও চারটি বসতঘর ভাঙচুর করার ঘটনা ঘটেছে। রাত সাড়ে ৭ টায় ওই ওয়ার্ডের স্টেডিয়াম কলোনীতে এই ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে বিজিবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।’ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে- জয়লাভ করার খবর পেয়েই মজিবরের সমর্থকরা বিজিত প্রার্থী (ঠেলাগাড়ি) মারুফ আহম্মেদ জিয়ার কর্মীদের ওপর হামলা করে। একপর্যায়ে তাদের একটি দোকন ও চারটি বসতঘর ভাঙচুর করে। বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মো. আসাদুজ্জামান বলেন- খবর পাওয়ার পরে পুলিশ সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু হামলা চালানোর পরপরই সকলে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

 

এই ঘটনায় অভিযোগ পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ তবে তার সমর্থকরা এই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে কাউন্সিলর মজিবর রহমান বলছেন- বিষয়টি শুনেছেন। কিন্তু কারা হামলা করেছে সেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ২.৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায় বিএনপির এক পোলিং এজেন্ট বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের জালিম সরকারের পক্ষে নৌকা মার্কার মেয়র প্রার্থীর পক্ষে আগাম সিল মারার একাধিক ব্যালট পেপার প্রদর্শন করেন। এছাড়াও সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র নগরীর বিভিন্ন এলাকাতে কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের মাঝে হামলার ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। প্রসঙ্গত, বরিশাল সিটি করপোরেশনে দুই লাখ ৪২ হাজার ৬৬৬ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ২১ হাজার ৪৩৬ ও নারী ভোটার এক লাখ ২০ হাজার ৭৩০ জন।

৩০টি সাধারণ ও ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড রয়েছে। এখানে ১২৩টি ভোটকেন্দ্র ও ৭৫০টি ভোটকক্ষ রয়েছে।