নুসরাত হত্যা ও পরবর্তী ঘটনা একনজরে

0
102

অনলাইন ডেস্ক ।। ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সারা দেশে আলোচনার ঝড় তোলে। মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে তারই নির্দেশে সহযোগীরা মাদ্রাসা ছাদে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে হত্যা করে।

এ ঘটনার ৬ মাস ১৮ দিন পর আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ।

এ ঘটনাপ্রবাহ একনজরে তুলে ধরা হল

এ বছরের ২৭ মার্চ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পিয়ন নুরুল আমিনের মাধ্যমে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। রাগে-ক্ষোভে নুসরাত সেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়।

তার অভিযোগের ভিত্তিতে ওইদিন পুলিশ অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরদিন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে একমাত্র আসামি করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে তাকে সে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

যৌন হয়রানির অভিযোগ করলে ২৭ মার্চ নুসরাত ও অধ্যক্ষকে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। পরে নুসরাতকে নিজ কক্ষে এনে বেআইনিভাবে জেরা ও তার ভিডিও ধারণ করেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

ওই ভিডিওতে দেখা যায়, থানায় ওসির সামনে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরতে গিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন নুসরাত। নুসরাত তার মুখ দুই হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। সে সময় ওসি মোয়াজ্জেম ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে’।

অধ্যক্ষ সিরাজ আটকের পর ২৮ মার্চ সোনাগাজীর জিরো পয়েন্টে তার সহযোগীরা পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমের নেতৃত্বে ‘অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা মুক্তি পরিষদ’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ করে। একই সময়ে সিরাজ-উদ-দৌলার বিচারের দাবিতে আরেক কাউন্সিলর শেখ আবদুল হালিম মামুনের নেতৃত্বে আরেকটি বিক্ষোভ হয়।

সেখানে দুই কাউন্সিলরের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অধ্যক্ষের পক্ষে বিক্ষোভে অংশ নেয়া কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, নূর উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন আসামি হয়।

৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষার আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে হলে বসলে নুসরাতের বান্ধবী নাসরিন সুলতানা ফূর্তিকে ছাদের ওপর মারধর করছে বলে সিরাজ-উদ-দৌলার শ্যালিকার মেয়ে উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা বা চম্পা বা তুহিন ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে বোরকা, মুখোশ ও হাত মোজা পরা ৪ জন দুর্বৃত্ত তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়।

নুসরাত রাজি না হলে একপর্যায়ে তারা গায়ের ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। আগুনে পুড়ে বাঁধন খুলে গেলে সে চিৎকার করে দৌঁড়ে নিচে নেমে আসে।

পরে পুলিশ ও কেন্দ্রে থাকা লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসকরা জানায়, নুসরাতের শরীরের ৭০/৮০ শতাংশ পুড়ে যায়।

নুসরাতের ওপর নৃশংস ও বর্বর ঘটনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে এলে তিনি মর্মাহত হয়ে ৭ এপ্রিল তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। তার নির্দেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ৭ চিকিৎসকের সমন্বয়ে মেডিকেল টিম গঠন করেন। এ সময় তিনি সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

পরদিন নুসরাতকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নিতে নির্দেশ দেন তিনি। তার নির্দেশ মোতাবেক ডাক্তাররা সেখানকার চিকিৎসকদের সঙ্গে কথাও বলেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর ১৫ এপ্রিল তার মা-বাবাকে প্রধানমন্ত্রী নিজ দফতরে ডেকে সান্ত্বনা দিয়ে ন্যায়বিচারের অশ্বাস দেন।

নুসরাতকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ৮ এপ্রিল তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৫), সোনাগাজী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৪৫), নূর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামিম (২০), জাবেদ হোসেন (১৯), হাফেজ আবদুল কাদের (২৫), যোবায়ের আহম্মেদ (২০), আবছার উদ্দিনের (৩৫) নাম উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়াও হাতমোজা, চশমা ও বোরকাপরা ৪ জনসহ অজ্ঞাত আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।

নুসরাত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

একই দিন দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পুলিশ হেডকোয়ার্টার সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করে আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়নে প্রেরণের নির্দেশ দেয়।

একইদিন মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর হয়।

১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সোনাগাজী সাবের পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নুসরাতের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন নুসরাতের বাবা মওলানা একেএম মুসা মানিক। ওই দিন সকাল থেকে নুসরাতের বাড়িতে ও স্কুল মাঠে হাজার হাজার মানুষ আসতে থাকে।

বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নুসরাতের লাশবাহী ফ্রিজারভ্যান বাড়িতে পৌঁছে। সেখান থেকে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে তার মরদেহ স্কুল মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়।

কর্তব্যে অবহেলার দায়ে এবং ওসি মোয়াজ্জেমের পক্ষে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে প্রতিবেদন প্রেরণের দায়ে ১২ মে ফেনীর পুলিশ সুপার এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়।

এর আগে পুলিশের দুটি তদন্ত টিম তার অবহেলার প্রমাণ পেয়ে পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর সরকারকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করে। এ ঘটনায় পুলিশ সুপারের অবহেলার বিবরণ দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করার জের ধরে পুরনো মামলায় ফেনীর চার সাংবাদিকের নাম দিয়ে ফাঁসিয়ে দেন জাহাঙ্গীর সরকার।

নুসরাতের যৌন নিপীড়নের ঘটনায় বেআইনিভাবে জেরা ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে ১৫ এপ্রিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন ব্যারিস্টার ছায়েদুল হক সমুন।

২৭ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলায় ১২৩ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন।

দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকার পর ১৬ জুন ঢাকার হাইকোর্ট এলাকা থেকে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর ২০ দিন আগে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

নুসরাত হত্যার ঘটনায় পুলিশের ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে হেডকোয়ার্টার। ১৯ এপ্রিল ঘটনাস্থল ও নুসরাতের বাড়িতে আসেন পুলিশ হেডকোয়ার্টারের ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্লানিং) এসএম রুহুল আমিন, একই দফতরের অ্যাডিশনাল এসপি সম্রাট মো. আবু সুফিয়ান, নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক মো. সালাহ উদ্দিন আরশেদসহ আরও দুই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা। তদন্ত চলাকালে তারা নুসরাতের মা-বাবা ও ভাই, মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।

নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম।

২৯ মে বুধবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইনের আদালেত ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিংবডির সহ-সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমীন এবং মহিউদ্দিন শাকিলের নাম উল্লেখ করে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

৩০ মে নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিন দুপুরে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইন মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য সব ধরনের নথিপত্র নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

২৯ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ১০ জুন তা আমলে নেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। একইদিন আদালতে ১৬ আসামির জামিন নামঞ্জুর করে তাদের জেলহাজতে প্রেরণ করেন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় নূর হোসেন, আলা উদ্দিন, কেফায়েত উল্যাহ জনি, সাইদুল ও আরিফুল ইসলামকে খালাস দেয় আদালত।

নুসরাত হত্যা মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমানের মধ্যদিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২৭ জুন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদের আদালতে টানা ৬ ঘণ্টা ধরে সাক্ষ্যপ্রদান করেন তিনি।

পর্যায়ক্রমে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার, বাবা একেএম মুসা মানিক ও ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানসহ মামলার ৮৭ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্যপ্রদান করেন। মামলার ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে বাকি ৫ জনের নথিপত্র আদালত সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করেন।

৩ জুলাই আদালতে নুসরাতকে যৌন হয়রানির অপর মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইনের আদালতে ২৭১ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এ মামলার অভিযোগপত্রে ডাক্তার, পুলিশসহ ২৯ জন সাক্ষী রয়েছে। পরদিন ৪ এপ্রিল তিনি এ মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক মো. মামুনুর রশিদের আদালতে প্রেরণ করেন।

নুসরাত হত্যা মামালার রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ও আসামি পক্ষের কৌঁসুলিরা তা খণ্ডন করেন। ১২ কর্মদিবস ধরে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের কৌঁসুলিদের মধ্যে আদালতে যুক্তি-তর্ক চলে। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর তা খণ্ডন শেষে আদালত রায়ের দিন তারিখ ধার্য করেন।

২৪ অক্টোবর বেলা ১১টার পর আলোচিত নুসরাত হত্যামামলার রায় ঘোষণা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ১৬ আসামির সবাইকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক মো. মামুনুর রশিদ।