দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের জের, জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমানের বাধায় সময়ের বার্তা পত্রিকা বন্ধ

0
270
স্টাফ রিপোর্টার: বরিশাল থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় দৈনিক আজকের সময়ের বার্তা পত্রিকার প্রকাশনা বিধিবর্হিভুতভাবে এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে বন্ধ করে রেখেছে বরিশাল জেলা প্রশাসন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২৭ ডিসেম্বর থেকে কোন লিখিত নোটিশ বা কারণ দর্শানো ছাড়াই পত্রিকাটির চুক্তিবদ্ধ ছাপাখানায় হুমকি দিয়ে ছাপা বন্ধ রাখা হয়েছে। এমনকি প্রকাশনার কোন নিয়ম ভঙ্গ না করলেও পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের হুমকি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো: হাবিবুর রহমান বলে অভিযোগ করেছেন সময়ের বার্তা’র প্রকাশক ও সম্পাদক এম. লোকমান হোসাঈন।
 
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মৌখিকভাবে কোন পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ রাখাটা বেআইনী। যদি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করতে হয় তাহলে সুর্নিদিষ্ট অভিযোগ ও প্রমান থাকতে হবে। এছাড়া শুধু মৌখিক নির্দেশে প্রকাশনায় বাধা প্রদানও করা যাবে না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনের উর্ধ্বেতো কেউ নন। অভিযোগ থাকলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না এমন কোন বিধান নেই।
 
এদিকে জেলা প্রশাসক মো: হাবিবুর রহমান মৌখিক নির্দেশনায় ছাপাখানা বন্ধ রাখার বিষয়ে বলেন, আমরা প্রশাসনে আছি। সুতরাং মৌখিকভাবে কোন নির্দেশ দেওয়া প্রাসঙ্গিক নয়। আমরা এর আগেও তাদেরকে নোটিশ দিয়েছি তারা তার সঠিক জবাব না দিয়ে উল্টো বলেছে সংবাদ সংক্রান্ত কিছু জানতে চাওয়াই নাকি আমার এখতিয়ারে পরে না। ওই নোটিশের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। আমরা আজ (২৮ ডিসেম্বর) আবারও একটি নোটিশ দিয়েছি। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে, জেলা প্রশাসনে কর্মরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনবরত সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে কিন্তু জেলা প্রশাসকের কোন বক্তব্য নিচ্ছে না। 
জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান আরও বলেন, পাঁচ মাস ধরে আমি এখানের জেলা প্রশাসক অথচ তার সাথে আমার পরিচয়ই নেই। 
অপর এক প্রশ্নের জবাবে জেলার এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আমরা সময়ের বার্তা পত্রিকার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। 
 
সরকারের প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে আজকের সময়ের বার্তা। এক বছরে দক্ষিণাঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বরিশাল জেলা প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তাদের বিধিবর্হিভূত কর্মকান্ড নিয়ে অনুসন্ধানে নামে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসনের দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশ পায়। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে জেলা প্রশাসন। ওইদিন সময়ের বার্তা পত্রিকার চুক্তিবদ্ধ ছাপাখানা ইভা অফসেট প্রেস-এর মালিক আমজাদ হোসেন মোল্লাকে জেলা প্রশাসনের জুডিশিয়াল শাখার অফিস সহকারী জামান হোসেনের মাধ্যমে ডেকে নেওয়া হয় জেলা প্রশাসন অফিসে। সেখানে জেলা প্রশাসক মো: হাবিবুর রহমান সময়ের বার্তা ছাপতে নিষেধ করেন। একই সাথে বলেন, না বলা পর্যন্ত ইভা অফসেট প্রেসে সময়ের বার্তা ছাপলে ‘অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে’। এমন কথা জানিয়ে আমজাদ হোসেন বলেন, বিকেলে র‌্যাব পরিচয়ে আমাকে একজনে মোবাইলে সময়ের বার্তা ছাপতে নিষেধ করেন।
 
যদিও ছাপাখানা আইন অনুসারে সময়ের বার্তার সাথে দুই বছরের চুক্তি রয়েছে ইভা অফসেট প্রেসের। চুক্তি অনুসারে পূর্ব ঘোষণা ছাড়া পত্রিকা ছাপা বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু জেলা প্রশাসনের ‘হুমকিতে’ সময়ের বার্তা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ছাপা বন্ধ করে দেন আমজাদ হোসেন মোল্লা।
 
এ বিষয়ে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)-৮ এর সিনিয়র এসপি ও অপারেশন অফিসার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধের বিষয়ে র‌্যাব ফোন দেয় না। তবে যে মোবাইল নাম্বার থেকে কল করা হয়েছে সেটি পাওয়া গেলে, সুনির্দিষ্ট করে বলা যেত কে কল করে হুমকি দিয়েছে। ওদিকে ইভা অফসেট প্রেসের মালিক আমজাদ হোসেন মোল্লার কাছে র‌্যাব পরিচয়দানকারীর মোবাইল নাম্বার চাইলে তা দিতে তিনি অস্বীকার করেন।
 
চুক্তিভঙ্গ করে পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ রাখায় সময়ের বার্তা পত্রিকা কর্তৃপক্ষের পক্ষে বরিশাল জজকোর্টের আইনজীবী মাহমুদা আক্তার মনি ইভা অফসেট প্রেস-এর মালিক আমজাদ হোসেনকে ২৮ ডিসেম্বর লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ করেছেন। লিগ্যাল নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছে, ২০১৬ সালের ১৯ অক্টোবর সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে পরবর্তী দুই বছর সময়ের বার্তা পত্রিকা মুদ্রনে বাধ্য। চুক্তি সম্পাদনের দিন থেকে প্রতিদিন নিয়মমাফিক পত্রিকা ছাপালেও ২৭ ডিসেম্বর থেকে চুক্তি অস্বীকার করে সময়ের বার্তার ছাপা বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের ক্ষতি হয়েছে এবং দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা করাসহ আইনগত ব্যবস্থা কেন গ্রহণ করা হবে না তার কারণ জানতে চেয়ে ৭ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।
 
ওদিকে ২৭ ডিসেম্বর পত্রিকা কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসকের সাথে স্বাক্ষাৎ করলে, জেলা প্রশাসক মো; হাবিবুর রহমান সময়ের বার্তা’র ডিক্লারেশন বাতিল করে দেওয়ার কথা বলেন। এছাড়াও পরামর্শ প্রদান করেন, দুর্নীতির সংবাদ না প্রকাশ করার জন্যÑবলে জানান লোকমান হোসাঈন। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করলে তার পত্রিকা প্রকাশ করতে দিবে না মর্মে অবহিত করেছেন। একই সাথে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সময়ের বার্তা’র ডিক্লারেশন বাতিলের নির্দেশ প্রদান করেন তার সামনেই।
 
সর্বশেষ ২৮ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসক মো: হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ প্রদান করা হয়েছে সময়ের বার্তা কর্তৃপক্ষকে। ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন প্রকাশিত দৈনিক আজকের সময়ের বার্তা পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রশাসনে কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য শ্রবণ না করে সংবাদ প্রকাশ করায় একদিকে যেমন প্রকৃত সত্য প্রকাশ পাচ্ছে না, অপরদিকে বস্তুনিষ্ঠ নয় এমন সংবাদ প্রকাশের কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত সুনাম এবং জেলা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। সময়ের বার্তায় জেলা প্রশাসনের কর্মচারীদের নিয়ে যে সব সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে তা সকল বিবেচনায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিপন্থি বলে ওই নোটিশে দাবী করা হয়। এই নোটিশে ৭ দিনের সময় দিয়ে কারণ দর্শাতে বলেছে। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে মর্মে জানানো হয়।
 
এর আগে চলতি বছরের ২৭ নভেম্বর সময়ের বার্তাকে একটি নোটিশ প্রদান করেন জেলা প্রশাসন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ১৩ নভেম্বর সময়ের বার্তায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকের ছবি প্রকাশ কেন করা হয়েছে তা জানতে চেয়ে ১০ দিনের সময় বেধে দেন। অন্যথায় ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনের ২০ এর (ঙ) (রা) ধারার আওতায় মানহানী এবং পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করার কথা বলা হয়। এর প্রেক্ষিতে ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে বরিশার জজকোর্টের আইনজীবী মো: জাহিদুর রহমান রাজিব স্বাক্ষরিত নোটিশের জবাব প্রদান করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনের যে ধারার কথা জেলা প্রশাসন উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ ২০ এর (ঙ) (রা) ধারার কোন অস্তিত্ব বিদ্যমান নেই। 
 
এ বিষয়ে এম লোকমান হোসাঈন বলেন, জেলা প্রশাসন সংবিধানের ৩৯ এর ২ (ক) ও (খ) অনুচ্ছেদ সরাসরি লঙ্ঘন করে এবং চাপপ্রয়োগ করে সময়ের বার্তা পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে রেখেছে। এভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, আইন পরিপন্থি কিছু করলে বিজ্ঞ আদালত তার বিচার করবেন। কিন্তু সংবাদ প্রকাশ করার অপরাধে কোন লিখিত নোটিশ ছাড়াই পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধকরা ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া কিছুই নয়।