প্রশান্ত মহাসাগরের ১০০ গুণ বড় সমুদ্রে ভাসছে বৃহস্পতি, শনির চাঁদ!

0
52

সময়ের বার্তা ডেস্ক।।

জল, শুধু জলে ভাসছে এই সৌরমণ্ডলের অন্য একটি গ্রহের দু’টি চাঁদ।

‘গুরুগ্রহ’ বৃহস্পতিই শেষমেশ দেখাল আলোর দিশা! বোধহয় একেই বলে গুরুকৃপা! আদিগন্ত, অতলান্ত জলে ভেসে যাচ্ছে বৃহস্পতির দুই চাঁদ ‘ইউরোপা’ আর ‘গ্যানিমিদ’।

যত সমুদ্র আর যত অতলান্ত মহাসাগর রয়েছে পৃথিবীতে, তার অনেক অনেক গুণ বেশি সমুদ্র আর মহাসাগরে ভেসে যাচ্ছে বৃহস্পতির ওই দুই চাঁদ। তরল জলে টইটম্বুর ইউরোপা আর গ্যানিমিদ। পৃথিবীর গভীরতম প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়েও অন্তত ১০০ গুণ বেশি গভীর মহাসাগর রয়েছে বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপায়। সুবিশাল সমুদ্র আর মহাসাগরে ভেসে যাচ্ছে বৃহস্পতির অন্য চাঁদ গ্যানিমিদেরও অন্তর-অন্দর। এত জল পৃথিবী দেখেনি কখনও। আর সেই তরল জলের মহাসাগরগুলি ঢাকা রয়েছে পুরু বরফের চাদরে। বিশাল বিশাল সমুদ্র আর মহাসাগরে ভেসে যাচ্ছে শনির দুই চাঁদ ‘টাইটান’ আর ‘এনসেলাডাস’ও। তবে সেই মহাসাগরগুলি ভাসছে তরল হাইড্রোকার্বনে। মিথেন ও ইথেনের সাগর, মহাসাগর।


বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা। বেরিয়ে আসছে ফুটন্ত জলের ধোঁয়া।

আজ, বৃহস্পতিবার রাতে সরকারি ভাবে এই ঘোষণা করবে নাসা। পৃথিবীর বাইরে এই সৌরমণ্ডলের আরও দু’টি গ্রহের চাঁদে সুবিশাল মহাসাগরের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে নাসা। ওয়াশিংটনে নাসার সদর দফতরে সেই ঘোষণা করা হবে আজ ভারতীয় সময় রাত সাড়ে ১১টায়। ওয়াশিংটনে নাসার সদর দফতর থেকে আনন্দবাজারকে এই খবর দিয়ে জানানো হয়েছে, ‘‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ও শনিতে পাঠানো নাসা ও ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইএসএ বা ‘এসা’) মহাকাশযান ‘ক্যাসিনি-হাইগেন্স’ যে সব ছবি ও তথ্যাদি পাঠিয়েছে, তা গত তিন বছর ধরে খতিয়ে দেখে ও বিশ্লেষণ করে বৃহস্পতির দুই চাঁদ ইউরোপা ও গ্যানিমিদে তরল জলের সুবিশা়ল, অতলান্ত মহাসাগরের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। সুনিশ্চিত হওয়া গিয়েছে শনির দুই চাঁদ টাইটান ও এনসেলাডাসের সুবিশাল হাইড্রোকার্বনের সমুদ্র সম্পর্কেও।’’


ইউরোপার দক্ষিণ মেরুতে পাওয়া মহাসাগরের হদিশ, হাবল স্পেস টেলিস্কোপে

নাসার সদর দফতরে ‘জেমস ওয়েব অডিটোরিয়ামে’ আজ রাতের সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির থাকবেন নাসার সায়েন্স মিশন ডাইরেক্টরেটের অ্যাসোসিয়েট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর টমাস ঝুরবুশেন, প্ল্যানেটরি সায়েন্স ডিভিশনের অধিকর্তা বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেমস (জিম) গ্রিন। সিনিয়র অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট মেরি ভয়টেক, নাসার জেট প্রোপালসান ল্যাবরেটরির (জেপিএল) ক্যাসিনি প্রোজেক্ট সায়েন্টিস্ট লিন্ডা স্পিলকার, দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী হান্টার ওয়েতে ও ক্রিস গ্লেন এবং বাল্টিমোরের স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম স্পার্কস।
ইউরোপার যেখানে রয়েছে তরল জলের মহাসাগর
আনন্দবাজারের তরফে ওয়াশিংটনে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়েছিল নাসার বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেমস গ্রিনের সঙ্গে। গ্রিন বলেছেন, ‘‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ আর ক্যাসিনি-হাইগেন্স মহাকাশযানের পাঠানো ছবি আর তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, পৃথিবীর চেয়ে অনেক গুণ বেশি গভীর ও বিশাল বিশাল মহাসাগর রয়েছে বৃহস্পতির দুই চাঁদে। যা আগামী দিনে আমাদের বৃহস্পতির ওই দু’টি চাঁদে মহাসাগর সন্ধান অভিযানে অনেক বেশি উৎসাহ জোগাবে। শুধু তাই নয়, এই সৌরমণ্ডলের অন্য দু’টি গ্রহেও (বৃহস্পতি, শনি) জলজ বা তরল হাইড্রোকার্বনে বেঁচে থাকতে পারে এমন প্রাণের হদিশ পাওয়ার ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাসকে আরও জোরালো করে তুলল। ২০২১/’২২ সালে ইউরোপায় পাঠানো হচ্ছে মহাকাশযান। আমাদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেছে বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা। দূরত্বের নিরিখে বৃহস্পতির কাছে থাকা চাঁদগুলির মধ্যে ষষ্ঠ এই ইউরোপা। সেখানে জলজ প্রাণের হদিশ না মিললেই আমাদের অবাক হতে হবে। আমাদের উৎসাহিত করেছে শনির চাঁদ এনসেলাডাসও। আকার-আকৃতির নিরিখে শনির ষষ্ঠ চাঁদ এনসেলাডাস। সেখানে হদিশ মিলেছে হাইড্রোকার্বনের সাগর, মহাসাগরের। টাইটানে মিলেছে তরল মিথেনের মহাসাগর। যেখানে হাইড্রোকার্বনের ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকতে পারে এমন অণুজীবের হদিশ পাওয়ার সম্ভাবনাকে অনেক বেশি জোরালো করে তুলেছে।’’
কী ভাবে নিশ্চিত হতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা?

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘সূর্য থেকে ৫০ কোটি মাইল দূরে থাকা বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা চওড়ায় ১ হাজার ৯০০ মাইল বা ৩ হাজার ১০০ কিলোমিটার। মানে, আমাদের চাঁদের চেয়ে কিছুটা ছোট। বৃহস্পতিকে তা পাক মারে সাড়ে তিন দিনে। তার একটা পিঠ সব সময় থাকে বৃহস্পতির সামনে। আমাদের চাঁদের মতোই। আমাদের জোরালো বিশ্বাস, ইউরোপায় পুরু বরফের চাদরের তলায় লুকিয়ে রয়েছে যে সুবিশাল, অতলান্ত মহাসাগরগুলি, তার জলের সঙ্গে ওই চাঁদের পাথুরে ম্যান্টলেরও যোগাযোগ রয়েছে। যেখানে থাকতে পারে প্রচুর পরিমাণে লোহাও। ফলে, তরল জলের সঙ্গে সেখানে অবাক করা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে যথেষ্টই। যা প্রাণের জন্ম ও বিকাশকে সাহায্য না করলেই অবাক হতে হবে। ২০১২ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের স্পেকট্রোগ্রাফেই ধরা পড়েছিল ইউরোপার ভূপৃষ্ঠ (সারফেস) থেকে উঠে আসছে ফুটন্ত জলের ধোঁয়া (প্লিউম)। ফুটন্ত জলের কেটলির মুখ থেকে যেমন ভাবে বেরিয়ে আসে ধোঁয়া। বৃহস্পতির অসম্ভব জোরালো অভিকর্য বলের জন্যই এটা হচ্ছে বলে আমাদের এখনও পর্যন্ত অনুমান।’’