ফেঁসে যাচ্ছেন জেলা প্রশাসনের ‘কালো বিড়াল’ ভূমি কর্মকর্তা নাজমুল!

0
1611

এম.লোকমান হোসাঈন ॥ সরকারের প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমিদস্যুদের রেকর্ড করিয়ে দেওয়ার অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন বরিশাল (সদর) ভূমি অফিসের সাবেক সহকারী কমিশনার নাজমুল হুসাইন খান (পরিচিতি নম্বর-১৬৭৭৩) ।

বর্তমানে তিনি বরিশাল জেলা প্রশসকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত কমিশনার পদে কর্মরত রয়েছেন। সরকারি সম্পত্তি ব্যাক্তি মারিকানায় পাইয়ে দেওয়া, নিরিহদের জিম্মি করে টাকা আদায়, অধস্তন কর্মচারীদের বদলীর ভয় দেখিয়ে টাকা ও মাসোহারা আদায়ের অভিযোগে ইতিমধ্যে মন্ত্রী পরিষদ নির্দেশিত বেশ কয়েকটি টিম তদন্ত শুরু করেছেন।

আর এতেই বিপাকে পড়েছেন বরিশালে সরকারী কর্মকর্তাদের মাঝে কালো বিড়াল খ্যাত এই নাজমুল হুসাইন খান। বরিশাল জেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শৃঙ্খলা অধিশাখার উপ-সচিব মোঃ শাফায়াত মাহাবুব চৌধুরী (১৪/১১/২০১৭ইং তারিখ) স্বাক্ষরিত আদেশে নাজমুল হুসাইন খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয় তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন এক মাসের মধ্যে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণের নির্দেমনা দিয়েছেন বরিশাল জেলা প্রশাসককে।

এর সত্যতা স্বিকার করেছেন জেলা প্রশাসক মো: হাবিবুর রহমান। জানা গেছে, নাজমুল হুসেইন খান ২০১৫ সালের প্রথম দিকে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অফিসে যোগদান করেন। তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে পটুয়াখালী জেলার বাউফলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসবে পোস্টিং দেওয়া হয়। বাউফলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে যোগদানের পরে সাধারণ মানুষের সাথে ঘুষের টাকা নিয়ে মারপিট করার অভিযোগে উঠলে নাজমুলকে বাউফল থেকে বদলী করে বরিশালে আনেন। এ পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার নাজমুলকে বরিশাল জেলা সদর (ভুমি) অফিসে যোগদানে নির্দেশ দেন। সদর (ভুমি) অফিসে যোগদানের পরপরই নাজমুল হুসেইন খান বেপোয়ারা হয়ে উঠেন।

২০১৬ সালের জুন মাস থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ প্রর্যন্ত বরিশাল সদর ভুমি অফিসের সহকারী কমিশনার পদে থাকাকালীন অবৈধ ভাবে সরকারের প্রায় ৬০/৭০ একর সম্পত্তি চিহ্নিত ভুমিদস্যুদের পাইয়ে দেওয়া ও মালিকানাধীন সম্পত্তির মালিকদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করে নেন বলে বিস্তর অবিযোগ পাওয়া যায়।

নগরীর ২৫ নং ওয়ার্ডের রুপাতলী মৌজার অর্থাৎ র‌্যাব-৮ এর স্থায়ী কার্যায়ের সম্মুখে সরকারে প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের খাস জমি (অর্পিত সম্পত্তি), রুপাতলীর বাসিন্দা মৃত মোঃ আলী হাওলাদারের ছেলে মোঃ মোকছেদ আলী মানিক হাওলাদার এবং কাশেম আলীর ছেলে সিরাজুল ইসলাম বাবুকে ভূমি অফিসের কর্মচারীদের যোগসাজসে মোটা অংকের টাকার বিনিময় জাল কাগজের মাধ্যমে রেকর্ড সংশোধন করে দেন।

যা সরকারি বিধান পরিপন্থি। জানা গেছে, রূপাতলী মৌজার জে. এল. নম্বর-৫৬, এস.এ. ১৮৫০ নং খতিয়ানের ১১৪৬ নং দাগের ৭২ শতক সম্পত্তির মূল মালিক রূপাতলী এলাকার বাসিন্দা হারান চন্দ্র পালের পুত্র জতিন্দ্র নাথ ও জিতেন্দ্র নাথ পাল। তাদের কোন বৈধ ওয়ারিশ না থাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্পত্তির উপর নজর পরে মোঃ মোকছেদ আলী, মানিক হাওলাদার এবং সিরাজুল ইসলাম বাবুসহ ভূমি খেকোদের। ২০১৪ সালে ৭২ শতক জমি রেকর্ড করার জন্য সদর উপজেলার জাগুয়া ও রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়ন ভুমি কর্মকর্তার বরাবর আবেদন করেন ওই ভূমিদস্যুরা।

আবেদনের সময় তাজকাঠী সাকিনের জনৈক মেছেরউদ্দিন হাওলাদারের ছেলে আঃ মজিদ হাওলাদারের নামে (ডিগ্রী) করার কপি রেকর্ড করার জন্য জমা দেন বিষয়টি সন্দেহ হলে ২০১৪ সালে তৎকালীন সদর উপজেলার জাগুয়া ও রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়ন ভুমি সহকারী কর্মকর্তা দেশপ্রিয় চক্রবর্তী রেকর্ড রুমে সার্সিং দেন। সার্সিংয়ের মাধ্যমে দেশপ্রিয় চক্রবর্তী জানতে পারেন ৭২ শতক জমির আসল মালিক রূপাতলী এলাকার বাসিন্দা হারান চন্দ্র পালের পুত্র জতিন্দ্র নাথ ও জিতেন্দ্র নাথ পাল।

তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ ইলিয়াছুর রহমান বরাবর খাস (অর্পিত সম্পত্তি) মর্মে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেন ইউনিয়ন ভুমি সহকা রি কর্মকর্তা দেশপ্রিয় চক্রবর্তী। ২০১৫ সালের ফেব্র“য়ারী মাসের ১৯ তারিখ সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ ইলিয়াছুর রহমান তৎকালীন তহশীলদার, সার্ভেয়ার ও কানুনগুকে সরেজমিনে তদন্ত করার নির্দেশ দেন। তদন্ত কারীদের তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ৭২ শতক জমি, ভূমি আইন ৯২ ধারার মোতাবেক খাস করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সহকারি কমিশনার (ভূমি) এর প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোঃ শহিদুল ইসলাম সরেজমিনে তদন্ত করেছেন এবং ওই জমির কোন মালিকানা না থাকায় বাংলাদেশ সরকারের ভূমি আইন ৯২ ধারার বিধান মতে ১ নং খাস খতিয়ানের আওতায় নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিতে নির্দেশ দেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশ অনুযায়ী সহকারি কমিশনার (ভূমি) উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ওই জমি খাস খতিয়ানে অর্ন্তভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব দেন।

অথচ, মাত্র এক বছরের মাথায় বিপুল পরিমান ঘুস নিয়ে এক মাস ২৩ দিনের স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘন ঘন তারিখ দিয়ে রুপাতলী এলাকার বাসিন্দা মৃত মোঃ আলী হাওলাদারের ছেলে মোঃ মোকছেদ আলী মানিক হাওলাদার এবং কাশেম আলীর ছেলে সিরাজুল ইসলাম বাবুর পক্ষে ৩৭/০২ নং একটি দেওয়ানি মামলার বরাদ দিয়ে ২০১৭ সালের জুলাই মাসের ২৩ তারিখ মিস কেস নম্বর-১০৫ কেটি ২০১৪-১৫ (১৫০) ধারা মোতাবেক ২০১৭ সালের সেপ্টম্বর মাসের ১৪ তারিখ মামলা নিম্পত্তি করেছেন।

পাশাপাশি সদর উপজেলার জাগুয়া ও রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়ন ভুমি কর্মকর্তাকে একই বছরের সেপ্টম্বর মাসের ১৮ তারিখ উঃভূঃঅঃ/বরি//সদর/২০১৬-১৭১৪ নং স্মারকপত্রের মাধ্যমে আদেশ মোতাবেক রেকর্ড সংশোধন করে তামিল প্রতিবেদন বরিশাল সদর ভুমি কমিশনারের কার্যালায়ে প্রেরণের জন্য নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগ এনে নগরীর আলেকান্দা এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ সরোয়ার হুসাইন বাবলা, নাজমুল হুসেইন খান’র বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে (২৪৮১/১৬) সিভিল রিভিশন মামলা দায়ের করেন। মামলায় নাজমুলের বিরুদ্ধে শোকাজ দেয়া হয়েছে। নাজমুল শোকজের কোন জবাব না দিয়ে বাবলার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করেন।

এদিকে বাবলা, নাজমুলের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট থেকে সিভিল রুল নং-৩২০ (কন্টেইট আর) মামলা দায়ের করেন। ২০১৭ সালের জুন মাসের ৫ তারিখ নাজমুলের বিরুদ্ধে আদালত কন্টেইট আদেশ প্রদান করে। জনপ্রশাসন মন্ত্রনালায় বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ সুত্রে আরও জানা যায়, নাজমুল হুসেইন খানের পিতা মোঃ ফারুক খান ফরিদপুর জেলার স্থায়ী বাসীন্দা ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় ওই ফারুক জামায়ত ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল আলী হোসেন মুজাহিদীর সক্রীয় আলবদর সৈনিক ছিলেন। ফারুক খান ১৯৭১ সনে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপরই ফরিদপুর জেলা ত্যাগ করে ঢাকা জেলার বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করেছিলেন।

পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ফারুক খান ঢাকা জেলার তেজগাঁও থানার পশ্চিম নাখালপাড়ায় বসবাস করেন এবং ঢাকা জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে নাজমুল হুসেইন খান সহকারী কমিশনার হিসাবে চাকরী নেন। পিতার স্থায়ী ঠিকানা ফরিদপুরে পুলিশ ভেরিফিকেশনে নাজমুলের বিরুদ্ধে জামায়ত-শিবিরের সম্পর্ক বিষয়সহ সকল গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে যেতে পারে বিধায় পিতার স্থায়ী ঠিকানা ফরিদপুরে দেন নাই। এদিকে দুর্নীতির কারনে নাজমুলকে অন্যথায় বদলী করা হচ্ছে জানতে পেরে গোপনে তদবীর করে বরিশাল কালেক্টরেটে সহকারী কমিশনার হিসাবে বদলী হন। যদিও অবিযোগের বিষয়টি খন্ডন করতে চেয়েছেন অবিযুক্ত নাজমুল।

তিনি জানান, ‘খ’ তফসিলের সম্পত্তি সরকারের কোনভাবেই দাবী করার সুযোগ নাই। এছাড়া তদন্তনাধীন অন্যান্য অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে, ফোনে জবাব দিতে অপরগতা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, নাজমুল হুসেইন খানের দুর্নীতির বিষয় যে অভিযোগ মন্ত্রীপরিষদ থেকে এসেছে সেটা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল কালাম আজাদকে তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্তনাধীন। হাবিবুর রহমান আরও বলেন, “খ” তফসিল ভূক্ত সম্পত্তি এসিলেন্ট এর এখতিয়ার রয়েছে।

তিনি সন্তুষ্ট হলে “খ” তফছিল সম্পত্তি আইনগত তার অবমুক্ত করে দিতে পারেন। জেলা প্রশাসক দাবী করেন, নথিটা আমি দেখেছি; দুই ভাবেই বিষয়টা সিন্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। নথিতে অস্পষ্টতা রয়েছে। আমি এডিসি রেভিনিউকে বলেছি এসিল্যান্ডের রায় বাতিলক্রমে এটা মূল খতিয়ানে সংযুক্ত করতে। যাতে সরকারের স্বার্থহানী না ঘটে।