বনমালীর সংঘাতের নেপথ্যে দুই কারন

0
196

বিএম কলেজে স্নাতক বা স্নাতোকত্তরের শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা প্রদান করতে পারছে না কয়েক যুগ ধরে। এ নিয়ে বছরের পর বছর আন্দোলন চললেও সুর্নিদিষ্ট কোন সমাধানে আসতে পারেনি কলেজ প্রশাসন। পরবর্তীতে বিধান করা হয়, স্নাতক শ্রেণীর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা প্রদান করা হবে। এছাড়া ডিগ্রী বা অনিয়মিতদের কলেজের হোস্টেলে থাকতে পারবে না।

বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রী নিবাসের সুপার প্রফেসর আবু সাদেক মোঃ শাহ আলম বলেছেন, ডিগ্রী পাস কোর্সের কোন ছাত্রী বনমালী ছাত্রী নিবাসে থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ডিগ্রী পাস কোর্সের এবং অনিয়মিত ছাত্রীরা এই ছাত্রী নিবাসে দিন দিন রাজত্ব কায়েম করছে।

২২ এপ্রিল হঠাৎ বনমালী গাঙ্গুলী উত্তপ্ত হয়ে ওঠার নেপথ্যেও এই একই কারন বিদ্যমান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিধান বর্হিভূতভাবে ডিগ্রী পাস কোর্সের ছাত্রী বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রীনিবাসে রাজনৈতিক পরিচয়ে নিবাসী হয়ে যথারীতি স্নাতক শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রী নিবাস সূত্রে জানা গেছে, ওই ছাত্রী নিবাসে মাত্র একজনই ডিগ্রী পাস কোর্সের ছাত্রী থাকেন। তিনি জান্নাতুল মীম।

বরিশাল সদর উপজেলার বাসিন্দা জান্নাতুল দুই বছর আগে বির্তকিত কর্ম কর্মপরিষদের (বাকসু) শীর্ষ এক নেতার সুপারিশে হোস্টেলে আসন নেন। তখন জান্নাতুল মীম নিজেকে ওই নেতার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বেড়াত। কিন্তু পরবর্তীতে প্রেক্ষাপট বদলে গেলে জান্নাত হয়ে যান সাদিক আব্দুলাহ অনুসারী।

অনুসন্ধানী সূত্র বলছে, ২২ এপ্রিলের সংঘাতের পেছনে রাজনৈতিক কোন কারণ বিদ্যমান নয়। মূলত ব্যক্তিগত একটি সম্পর্কের টানপোড়েনে শেষে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে জান্নাতুল মীম, ফাতেমা, শারমিন, ইভা, ঐশী এবং ঝুমুর প্রত্যেকেই পরস্পরের ভাল বন্ধু এবং এদের সিনিয়র আপু হিসেবে পরিচিত বির্তকিত দুই ছাত্রলীগ নেত্রী মুনিরা ও সাদিয়া।

বিএম কলেজের বাকসুর প্রভাব চলে যাওয়ার পরে, মুনীরা ও সাদিয়ার বুদ্ধিতে এই ছয়জন অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হয়ে যান। এরা প্রত্যেকেই মূলত সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারী ছাত্রলীগ নেতা সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত, আতিক উল্লাহ মুনিম, রুবায়েত সাজ্জাত পিয়াল এর অনুসারী। যদিও এদের ‘সিনিয়র আপু’ দুজন বাকসুর নেতাদের অনুসারী। হোস্টেলে ছাত্রী কে থাকবে আর কে থাকবে না তা সিদ্ধান্ত দিত এরা। এমনকি তাদের মাদক সেবনের বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট।

ঝুমুর দাবী করেছেন, বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রীনিবাস সরকারি প্রতিষ্ঠানের হওয়ায় সাধারণত এখানে পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলা বাহীনী কোন অভিযান পরিচালনা করত না। সেই সুযোগে জান্নাত, ফাতেমা, ইভা, ঐশী, শারমিন মিলে ইয়াবা চক্রের সাথে জড়িয়ে পরে। তার দাবী অনুসারে, এরা ইয়াবা বিক্রি না করলেও নিয়মিত সেবন করত। তবে জান্নাত এই বক্তব্য প্রত্যাখান করেছে।

জান্নাত দাবী করেছেন, ছাত্রীদেরকে জিম্মি করা, মাদক পাচার এবং নবাগত ছাত্রীদের মারধর করত ঝুমুর। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, ২২ এপ্রিলের ঘটনাটি ঘটেছে একটি আড্ডার ছবি বাইরে ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে। জানা গেছে, স¤প্রতি এই ছয়জন একটি কক্ষে আড্ডারছলে ‘ইজি লাইট’ ব্রান্ডের সিগারেট পান করছিল। কৌশলে কেউ সেই ছবিটি মুঠোফোনে তুলে রাখে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ছয়জনের দু’জন নিশ্চিত করেছে, সিগারেট পানের তোলা ছবিটি জান্নাতুল মীমের। যদিও জান্নাতুল তার মুঠোফোনে (২২ এপ্রিল রাতে) নিজেকে ‘হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোপা’ পরিচয়ে দাবী করেছে, সে সিগারেট পান করে না। ঝুমুর তার হাতে সিগারেট দিয়ে দুষ্টমি করে ছবি তুলে পরে জিম্মি করছে।

ওদিকে ঝুমুর দাবী করেছে, সিগারেট সেবন জান্নাতুলের কাছে সামান্য বিষয়। এই সার্কেল অত্যান্ত রাখঢাক বজায় রাখে। ২২ এপ্রিল মারধরের শিকার এই ছাত্রীর দাবী, ও (জান্নাত) তার ছেলে বন্ধুদের এসব ছবি মেসেঞ্জারে পাঠাত। হয়তো কারও সাথে সর্ম্পক ভেঙ্গে যাওয়ায় ওই ছেলে জান্নাতের সিগারেট পান’র ছবি বাইরে ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেসব খতিয়ে না দেখে আমাকে সন্দেহ করছে যে আমি ওই আড্ডার ছবি তুলে বাইরে প্রকাশ করেছি। সেই ধারণা থেকেই আমাকে সংঘবদ্ধ হয়ে ফাতেমা, শারমীন, ইভা, ঐশী ও জান্নাত মিলে আমার কক্ষে মারধর করে। এতে আমার হাত কেটে গেছে এবং মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হই।

ঝুমুর বলেন, আমার আসবাবপত্র এরা নিয়ে যায় এবং নতুনবাজারে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। ওদিকে জান্নাতুল

মীম জানিয়েছেন, ঘটনার সূত্রপাত মূলত আমাকে ছাত্রী হোস্টেলে খেতে বাধ্য করার মাধ্যমে শুরু হয়। এই ছাত্রী দাবী করেন, আমি দীর্ঘদিন থেকে আবু মিযার হোটেল থেকে খাবার এনে খাই। কিন্তু মুনিরা ও সাদিয়ার পরামর্শে ঝুমুর আমাদের বন্ধু হওয়া সত্যেও চাপ দিয়ে আসছিল যেন আমি হোস্টেলে খাওয়া শুরু করি। কিন্তু আমার শরীরে অপারেশনের কারনে তা সম্ভব হয়নি। এই অপারগতার কথা জানা সত্যেও সে (ঝুমুর) তিনদিন আমাকে বিভিন্ন কক্ষে আটকেছে মারধর করবে বলে।

জান্নাতুল মীম বলেন, সিগারেট পানের যে ছবিটি সেটি মূলত আমাকে ব্লাকমেইল করার জন্য। এর মূল কাহিনী হল, কিছুদিন আগে ঝুমুরের বয়ফ্রেন্ড তাকে ছেড়ে যায়। তখন সে নিজে আত্মহত্যা করবে বলে চেষ্টা চালায়। ফার্মেসী থেকে বিভিন্ন ধরনের ঘুমের ওষুধ এনে খেয়ে শুধু ঘুমাত। তখন ওকে আমি মানসিক সাপোর্ট দিয়েছি। সেসময়ে ওর অপর এক বন্ধুর মাধ্যমে সিগারেট নিয়ে আসে রুমে। সেই সিগারেট আমার হাতে দিয়ে গোপনে ছবি তুলে রাখে পরে প্রচার করে, জান্নাত যদি কথা না শোনে তাহলে এই ছবি বাইরে ভাইরাল করে দেব।

এ বিষয়ে বিএম কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, একেবারে ঠুনকো ভুলবোঝাবুঝির মাধ্যমে শুরু হয়। এটি পারিবারিক শিক্ষার অভাব। এরা বন্ধুত্বর মূল্য দিতে পারে না। সে কারনেই এত জটিলতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই শিক্ষক বলেন, ঘটনাটি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে। এটা মোটেই ঠিক নয়। সবার উচিত সংযত হওয়া।

এ বিষয়ে বিএম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শফিকুর রহমান শিকদার বলেন, ঘটনাটি নিয়ে যতটা রাজনীতি করা হচ্ছে তা মোটেই রাজনীতিক নয়। তবে ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নুসরাত জাহানকে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

ওদিকে ২২ এপ্রিল ঝুমুরকে তাড়িয়ে দেওযার পর এখনো ছাত্রীনিবাসে প্রবেশ করতে পারেনি ওই ছাত্রী।