বন্ধ হচ্ছে সিটি নির্বাচন?

0
37

সোহানুর রহমান ॥ বরিশাল সিটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (জাপা) দলীয় মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও বাদ পড়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী বশির আহম্মেদ ঝুনু।

আপিল শুনানিতে তাপস ঋণ খেলাপী নন বলে যথাযথ প্রমান প্রদর্শন করলে তাতে ব্যাংক প্রতিনিধি সায় দিলে তিনি প্রার্থীতা ফিরে পান।

সমর্থক ভোটারদের একজনের অস্তিত্ব না পাওয়ায় জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী (স্বতন্ত্র) বশির আহম্মেদ ঝুনুর আপিল খারিজ করে দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার।

গতকাল বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আপিল কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুজ্জামান পৃথক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এদিকে বশির আহম্মেদ ঝুনুর আপিল খারিজ করে দেওয়াতে হাইকোর্টে আপিল করবেন বলে তিনি জানান।

তবে হাইকোর্টে নিজের প্রার্থীতা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি আগামী ৩০ জুলাই ঝুনুবিহীন নির্বাচন হতে না দিতেএই মেয়র প্রার্থী হাইকোর্টে রিট করবেন বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতে শরণাপন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) বরিশাল জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বশির আহমেদ ঝুনু।

তিনি মনে করছেন চক্রান্ত করে নির্বাচন কমিশন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এদিকে এসব আইনী জটিলতায় পড়ে তফসিল অনুযায়ী ৩০ জুলাই বরিশাল সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিনা এনিয়ে আশংকা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

বিসিসি নির্বাচন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি উল্লেখ করে উদাহরণ হিসেবে তারা বলছেন গাজীপুরের সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও স্থগিত করেছিল হাইকোর্ট। তাপসকে ছাড় না দিতে ঝুনুর আইনী লড়াইয়ের প্রক্রিয়ায় পরে গাজীপুরের মত বরিশাল সিটি নির্বাচন ভেস্তে যেতে পারে বলে তাদের মত।

সূত্রমতে, মনোনয়ন যাচাই বাছাইয়ে ঋণখেলাপির অভিযোগে গত রোববার ইকবাল হোসেন তাপস এবং সমর্থক ভোটারদের একজনের অস্তিত্ব না পাওয়ায় ও একজন নিরক্ষর সমর্থকের স্বাক্ষর জাল করায় বশির আহম্মেদ ঝুনুর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রির্টাানিং অফিসার মো. মজিবুর রহমান। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দুজনেই আত্মপক্ষ সমর্থনে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আপিল করেন ।

আপিল কর্তৃপক্ষের প্রধান বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ইকবাল হোসেন তাপস সোনালী ব্যাংকের ঋণখেলাপি ছিলেন। দুপুরে আপিলের শুনানির দিন সোনালী ব্যাংকের প্রতিনিধিরা আপিল বোর্ডে উপস্থিত থেকে তিনি ঋণখেলাপি নন বলে নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি এর স্বপক্ষে কাগজপত্র উপস্থাপন করলে তাপসের মনোনয়পত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসের মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ায় নির্বাচনে লড়তে তার কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং অফিসার মো. মজিবুর রহমান। পাশাপাশি দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর শুনানি আগামী শনিবার হবে বলে জানিয়েছেন জেলা নির্বাচন অফিসার।

মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি ত্র“টিপূর্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিল নির্বাচন কমিশন। আপিল করলে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কর্তৃপক্ষ।

সেখানে আমার প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য ও প্রমাণাদি দাখিল করেছি। ট্রাইব্যুনাল তাতে সন্তুষ্ট হয়ে নির্বাচন করার বৈধতা প্রদান করেছেন। অন্যদিকে, মনোনয়নপত্র দাখিল করার সময় স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে ৩০০ জন ভোটারের স্বাক্ষর সংবলিত তালিকা দিতে হয়।

সেখান থেকে পাঁচজন ভোটারকে নির্বাচিত করে তাদের সাথে যোগাযোগ করে যাচাই-বাছাই কমিটি। স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীর পক্ষে একজন ভোটারকে না পাওয়ায় এবং একজন নিরক্ষর ভোটারের জাল স্বাক্ষর চিহ্নিত হওয়ায় বশির আহমেদ ঝুনুর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

এরপর মেয়র পদে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেছিলেন তিনি। শেষ পযর্ন্ত আর ভোটের মাঠে টিকে থাকতে পারলেন না এই জাপা নেতা। তবুও নাছোড়বান্দা ঝুনু আশা ছাড়ছে না।

জানতে চাইলে বশির আহমেদ ঝুনু বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। চক্রান্ত করে আমাকে আমার মনোনয়ন বাতিল করানো হয়েছে। কে ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত করছে জানতে চাইলে ঝুনু এক পর্যায়ে বলেন, নির্বাচন কমিশন আমার পক্ষে নয়।

আমি হাইকোর্টে যাব। সব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল নস্যাৎ করে ভোটযুদ্ধে ফিরতে পারবেন বলে ঝুনুর আশাবাদ। তথ্যানুযায়ী, আট মেয়র প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিত্তশালী জাপার তাপস। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি পাস এ নেতার আয়ের উৎস ব্যবসা। হলফনামা বলছে তিনি চারটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক।

যার মধ্যে ইওকোহমা লেবেলস অ্যান্ড প্রিন্টিং (বিডি) লিমিটেডের নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাউথ অ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাউথ অ্যাপোলা ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে প্রাইভেট লিমিটেড ও সাউথ অ্যাপোলা প্রপার্টিজ কমপ্লেক্স প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক।

তাপস তার হলফনামায় সর্বশেষ দাখিল আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৫৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪৮৫ টাকা। যার মধ্যে ব্যবসা থেকে আসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, সম্মানী ভাতা ৫৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭০৯ টাকা, সঞ্চয়ী আমানতের সুদ ৩ হাজার ৭৭৬ টাকা।

অস্থাবর সম্পদের মধ্যে তিনি নগদ ৯৩ লাখ ৪৯ হাজার ৭৯৬ টাকার কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ২০ লাখ ৪ হাজার ১০২ টাকা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগের শেয়ারের মূল্য দেখিয়েছেন ৪৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। প্রতারণার ধারা সংবলিত দু’টি মামলা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক স্থগিতাদেশ থাকা দু’টি মামলার আসামি তাপসের গাড়ি রয়েছে ১টি।

হলফনামায় দেয়া তথ্যানুযায়ী তার মূল্য ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৬৭ টাকা। এছাড়া অজ্ঞাত উপহার হিসেবে দেখানো ৬০ তোলা স্বর্ণ ছাড়াও তার রয়েছে ৫১ হাজার ৫৬৫ টাকার আসবাবপত্র। স্থাবর সম্পদের মধ্যে তার যৌথ মালিকানায় ২ দশমিক ২৭৫ একর কৃষি জমি রয়েছে। সেখান থেকে তিনি দশমিক ৪৪২৪ একর সম্পত্তির মালিক। এছাড়া যৌথ মালিকানায় তার দশমিক ০৫০৪ একর (৫ শতাংশের বেশি) জায়গার ওপর পাঁচতলা একটি ভবন রয়েছে।

কার ও গৃহ সংস্কার লোন বাবদ ঢাকার মোহাম্মদপুরের পূবালী ব্যাংক ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের প্রাইম ব্যাংকের শাখায় মোট ২৫ লাখ ১০ হাজার ২৩৩ টাকার ঋণ রয়েছে তাপসের। তাপস ও ঝুনুর মত মনোনয়নপত্র বাতিলের আদেশকে চ্যলেঞ্জ করে আপিল করেছিলেন ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সৈয়দ জামাল হোসেন নোমান।

তবে ১৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সুমন হাওলাদার আশিষের মনোনয়ন বাতিল হলেও তা চ্যালেঞ্চ করে কোন রিট আবেদন করেননি তিনি। আশিষ বলেন, যে ঋণ খেলাপির দায়ে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে সে ঋণ মূলত আমার জন্য ছিল না। ব্যাংক থেকে ২ লাখ টাকা এনে স্থানীয় এক ফার্মেসী ব্যবসায়ীকে ধার দিয়েছিলাম। নির্বাচনে অংশ নিতে হলে এখন আমাকে ওই টাকা পরিশোধ করতে হবে।

তা সম্ভব নয় বিধায় আর রিটও করব না; নির্বাচনেও অংশ নিব না। এর ফলে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় আবারও কাউন্সিলর হতে যাচ্ছেন গাজী নইমুল হোসেন রিটু। এদিকে মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়া ৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রাার্থী সৈয়দ জামাল হোসেন নোমান বলেন, ৩ জুন বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রিট আবেদন করেছি।

৫ জুলাই শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও তা আগামী ৭ জুলাই হবে বলে শুনেছি। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রিয় নির্দেশনা মেনে বিএনপির শরীক খেলাফত মজলিশের প্রার্থী অধ্যাপক মাহবুব আলম আগামী শনিবার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করতে পারেন বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।