বরিশালে ছাত্রদল নেতা লিমনের ইন্ধনে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ গাইড বই

0
384

এম. লোকমান হোসাঈন ॥ সৃজনশীল পদ্ধতি বলতে মূলত মূল পাঠ্য বইয়ের যে বিষয় রয়েছে সেখান থেকে প্রশ্ন না করে তারই মূল ভাবের আলোকে জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা এই ৪ টি ধাপে প্রশ্ন করাকে বোঝায়।

অথচ, কথিত পুস্তক ব্যবসায়ীরা অবৈধ মুনাফা লাভের আসায় বরিশাল সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারর নিষিদ্ধ নোট-গাইড বই কিছু জ্ঞান পাপীদের সহযোগিতায় শিশুদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বরিশাল সদর রোডস্থ সিটি লাইব্রেরী, ইসলামিয়া লাইব্রেরী, খন্দকার লাইব্রেরী, মাহাবুব লাইব্রেরী ও অরিয়ন্টাল লাইব্রারীসহ নগরীর একাধিক বইয়ের দোকানে সরকার কর্তৃক অননুমোদিত গাইড বইয়ের ছড়াছড়ি।

দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে শুরু করে স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন নামে বিভিন্ন কোম্পানির গাইড বই বিক্রি হচ্ছে। এদের মধ্যে প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, দ্বিতীয় শ্রেণি হতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাজারে থাকা গাইড বইয়ের অন্যতম প্রকাশনা সংস্থাগুলো হলো- লেকচার, অনুপম, জননী, জুপিটার, পাঞ্জেরী, পপি ও নবদূতসহ একাধিক কোম্পানি। অন্যদিকে নবম ও দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাজারে প্রাপ্ত গাইড বইয়ের প্রকাশক হলো- রয়েল, কম্পিউটার , জুপিটার, পাঞ্জেরী, লেকচার, অনুপম, আদিল ও ইংরেজি ভার্সনের জন্য ক্লাসিক। এছাড়া, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য গাইড বইয়ের প্রকাশনী হিসেবে বাজারে, লেকচার, কাজল ব্রাদার্স, জুপিটার, জ্ঞানগৃহ, পাঞ্জেরী, পপি, দি রয়েল সায়েন্টেফিক পাবলিকেশন্স ও মিজান লাইব্রেরি বই পাওয়া যায়।

যা বরিশাল প্রশাসনের নীরাবতায় প্রতিনিয়ত প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ এই নোট-গাইড বইগুলো। অনুসন্ধানে আরো দেখা যায়, সরকারী নির্দেশ উপেক্ষা করে বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকার স্কুল-কলেজগুলোর জ্ঞান পাপীদের সহযোগিতায় নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে এই বই গুলো বিপুল পরিমান অর্থের মাধ্যমে “পাঠ্যপুস্তুত করেন” এবং সেগুলো শিক্ষার্থীদের বই কিনতে বাধ্য করেন ওই সকল স্কুল-কলেজের প্রধান শিক্ষক ও সভাপতিরা। পাশাপাশি নিজেরা বিভিন্ন কোম্পানির বই স্কুলে রেখে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন সেগুলো কিনতে। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা সরকার কর্তৃক স্কুলের নতুন বই উপেক্ষা করে তারা নিষিদ্ধ গাইড বই কেনার জন্য উৎসাহিত হয়ে পরে। এর কারণে মূল শিক্ষা থেকে তারা পিছিয়ে পরে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা গাইড নির্ভরশীল হয়ে পরেন। কোম্পানি গুলোর কাছ থেকে তারা বিনামূল্যে প্রশ্নপত্র নিয়ে থাকেন। সেই প্রশ্নপত্র দিয়ে অর্ধবার্ষিকী এবং বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে থাকে।

এর কারণে শিক্ষার্থীরা ওই গাইড কিনতে বাধ্য থাকে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্য পুস্তক বাদ দিয়ে গাইড বইয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে পরে। অথচ, সরকার প্রতিবছর কোটি টাকা ব্যায় করে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ করে থাকে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা পাঠ্য পুস্তক বিমুখ হওয়ায় এটা তাদের কোন উপকারে আসে না। এর ফলে, মূল মেধা থেকে পিছিয়ে পরছেন শিক্ষার্থীরা। সিটি লাইব্রেরীর প্রোপাইটার শান্তি রঞ্জণ দাস ওরফে আব্দুর রব পাশা দাবী করেন নিষিদ্ধ বই বিক্রি করতে প্রতি মাসে পুলিশ প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাঁদা দিয়ে নিষিদ্ধ গাইড বই সহ অন্যান্য নিষিদ্ধ বই বিক্রি করে থাকি। মাসে কত টাকা চাঁদা দিতে হয় সে বিষয় জানাতে চাইলে শান্তি রঞ্জণ দাস জানান, তাদের বরিশালস্থ পুস্তক বিক্রেতা সমিতির সভাপতি ও খন্দকার লাইব্রেরীর প্রোপাইটর খন্দকার আবুল হোসেন লিমন ও সাধারণ সম্পাদক এবং ইসলামী লাইব্রেরীর প্রোপাইটর সিদ্দিক এর সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলেন।

এদিকে সংগঠনের সভাপতি খন্দকার আবুল হোসেন লিমনের মুঠোফোনে একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্য দিকে নিষিদ্ধ গাইড বই বিক্রির জন্য আগামী মাস পর্যন্ত হাইকোর্টের একটি অনুমতি আছে বলে দাবী করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিক। সিদ্দিক আরো জানান, গাইড বই বাজারজাত করার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ কোম্পানি কিভাবে তাদের গাইড বই বিক্রি করবেন সেটা তাদের ব্যাপার। তবে এর জন্য তাদের নিজস্ব সেলসম্যান দ্বারা স্কুল ও কলেজে গিয়ে মার্কেটিং করে থাকেন বলে দাবী সিদ্দিকের। উল্লেখ্য, নোট বই প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে ১৯৮০ সালে একটি আইন করা হয়। কিন্তু সেই আইন যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়নি। এরপর গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নোট বই ছাপানো বন্ধের উদ্যোগ নেয়। মন্ত্রণালয় ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর সরকারের অননুমোদিত নিম্নমানের বই, নোট ও গাইড বই বাজারজাত বন্ধ করতে প্রয়োজনে মোবাইল কোর্টের সাহায্য নিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেয়।

এ নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রয় সমিতির সভাপতি আবু তাহের ২০০৮ সালের ফেব্র“য়ারিতে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। রিট আবেদনে বলা হয়, নোট বই নয়, গাইড বই প্রকাশ করে তা বাজারজাত করা হচ্ছে। কিন্তু রিট আবেদনকারীর যুক্তি খণ্ডন করে হাইকোর্ট একই বছরের ১৩ মার্চ ১৯৮০ সালের নোট বই নিষিদ্ধকরণ আইনের আওতায় নোট বইয়ের সঙ্গে গাইড বইও বাজারজাত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করে মন্ত্রণালয়ের আদেশ বহাল রাখেন। হাইকোর্টের রায়ের পর রিট আবেদনকারী আপিল করবেন উল্লেখ করে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করতে আপিল বিভাগে একটি আবেদন করেন।

ওই আবেদন খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। সচেতন শিক্ষক ও অভিভাবকদের মন্তব্য, ‘সরকার যদি জাতির ভবিষ্যত শিশুদের মেধা-মননের সুষ্ঠু বিকাশ চান, তাহলে অবশ্যই বাজারের এসব নিষিদ্ধ-ঘোষিত নোট-গাইড বই মুদ্রণ শীঘ্রয়ই বাজারজাতকরণ বন্ধ করতে হবে। নয়তো সরকারের সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নের স্বপ্ন পিছিয়ে পড়বে।’ এ ব্যপারে বাজারে নিষিদ্ধ নোট-গাইড বই প্রকাশ্যে বিক্রির বিষয় মোবাইল কোর্ড এর মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে জানান, বরিশাল জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান।