বাবুগঞ্জে অবৈধ ইট ভাটায় প্রশাসনের হানা অসাধু কর্মকর্তারা নারাজ!

0
319

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাবুগঞ্জে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধ ইট ভাটার বাণিজ্য! শিরোনামে গত মাসের ২৮ তারিখ সময়ের বার্তায় একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর মাঠে নামেন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গতকাল বরিশাল জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় অভিযান চালিয়ে মের্সাস আকন ব্রিকসকে আড়াই লাখ টাকা সহ মোট ৪টি ইটভাটাকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এর আগে গত সোমবার বানারীপাড়ায় দু’টি অবৈধ ইট ভাটায় অভিয়ান চালিয়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোজাম্মেল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে র‌্যাবের সহায়তায় সোমবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযান চলার সময় অবৈধ ভাবে ইট প্রস্তুত করার দায়ে বাইশারি এলাকার মেসার্স আল্লাহর দান ব্রিকসের ম্যানেজার মো. আলকাছ মোল্লাকে ৩ লাখ এবং ডুমুরিয়া এলাকার মেসার্স কালাম ব্রিকসের প্রোপাইটর বেগম শিরিনকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযানের সময় অবৈধ ভাবে উৎপাদিত ইট ধ্বংস করেন ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা। উল্লেখ্য, গত মাসে পরিবেশ অধিদপ্তর, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের ওয়েবসাইট ওপেন করলেই প্রথমে সেবার তালিকায় দেখা মিলবে আবেদনের প্রেক্ষিতে পরিবেশগত ছাড়পত্র/নবায়ন প্রদান, বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরিদর্শনপূর্বক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের আবেদনের বাযু, শব্দ, তরল ইত্যাদি পরীক্ষামূলক ফলাফল প্রদান এই তিনটি মূলমন্ত্র। এই তিনটি মন্ত্রের অনুসন্ধান করলে বেড়িয়ে আসে কার্যালয়ের পরিচালক মোঃ আবদুল হালিম কর্তৃক ছাড়পত্রের কোটি টাকার বাণিজ্যের চিত্র।

পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেও বছরের পর বছর ছাড়পত্রের নামে চলছে রমরমা উৎকোশ বাণিজ্য। অনুসন্ধানে দেখা যায় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই বছরের পর বছর বরিশাল জেলাসহ আশপাশে ব্যাঙ্গের ছাতার মত ঘড়ে উঠেছে একের পর এক অবৈধ ইটভাটা। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটায় প্রতিবছর পরিবেশ দুষণের পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে গ্রামের ফলজ গাছগুলোতে ফল ধরা বন্ধ হয়ে গেছে। একইভাবে জনদূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাবুগঞ্জ উপজেলার দোয়ারিকা, শিকারপুর সহ এ অঞ্চলের কয়েক হাজার বাসিন্দাদের।

প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও চালু হয়েছে বরিশাল উপজেলার বাবুগঞ্জ দোয়ারিকা পুরাতন ফেরিঘাট এলাকার মেসার্স মাস্টার ব্রিকস্, ইসলাম ব্রিকস্, মেসার্স আকন ব্রিকস্, রাজা ব্রিকস্, মেসার্স রানা ব্রিকস্, মেসার্স সোহান ব্রিকস্, মেসার্স ফাইন ব্রিকস্, মেসার্স স্টার ব্রিকস্ হোপ ব্রিক্স ও বাবুগঞ্জ এলাকার গাজীপুরের মেসার্স সায়েম ব্রিকস্ সহ অসংখ্য ইটভাটায় বছরের বছর ইট প্রস্তুত ও সরবরাহকারী করে আসছে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এই ইটভাটার চারপাশে ঘণবসতিপূর্ণ গ্রামগুলোতে রয়েছে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সড়ক-মহাসড়ক ও হাট-বাজার। এসব ইটভাটার কালো ধোঁয়ার বিরূপ প্রভাবে মরে যাচ্ছে গ্রাম অঞ্চলগুলির ফলজ, ওষুধি গাছ।

ইতিপূর্বে ওইসব গ্রামের অধিকাংশ ফলদ গাছের ফল ধরাও বন্ধ হয়ে গেছে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসকল ভাটা মালিকরা বলছেন, ইটভাটার অনুমোদন চেয়ে সংশি¬ষ্ট দফতরে ইতি মধ্যে আবেদন করেছেন। সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদনের চেয়ে বাৎসরিক মাশওয়ারা নিতেই বেশী পছন্দ করেন। এজন্যই অনুমোদনের প্রতি তাদের গুরুত্ব নেই বললেই চলে। ইট ভাটার মালিকদের বক্তব্য প্রতি বছর জেলা প্রশাসক কার্যালয়, বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় থানা পুলিশ ও সাংবাদিকদের চাঁদা দিয়ে ইট প্রস্তুত ও সরবরাহ করে আসছেন। এজন্যই তাদের কোন কাগজপত্র প্রয়োজন হয় না বলে মালিকদের দাবী।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইটভাটার একাধিক মালিক সময়ের বার্তাকে জানান, প্রতিবছর বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্তৃপক্ষকে ইটভাটা প্রতি ৫লাখ, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মকর্তাকে ৪ লাখ, স্থানীয় উপজেলা কার্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে ৩ লাখ, ফায়ার সার্ভিস অফিসের কর্তৃপক্ষকে ২ লাখ, স্থানীয় থানা পুলিশকে ২ লাখ অপরদিকে কাস্টমস, এক্্রাইজ ও ভ্যাট বরিশাল বিভাগের কর্মকর্তাকে ৬ লাখ ও বিএসটিআই আঞ্চলিক অফিসের কর্তৃপক্ষকে ৩ লাখ এবং সাংবাদিকদের প্রায় ৩ লাখ টাকা অথাৎ প্রায় বছরে মোট ২৮ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে আসছেন এইসকল অবৈধ ইটভাটার মালিকরা। তারা আরো জানান, টাকা দিতে দেরি হলে সংশি¬ষ্ট দফতরের কর্তৃপক্ষ থেকে নানান ঝামেলায় পরতে হয় তাদের। অনেকে পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেও ছাড়পত্র পাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ বলছেন তাদের কাগজপত্র সঠিক আছে কর্তৃপক্ষ তাদের ইটভাটার অনুমোদন দিয়েছেন।

যদিও তারা এবিষয় কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেন নাই। কিছু অসাধু কর্তাবাবুদের ইন্ধনে বছরের পর বছর এভাবেই অবৈধভাবে গড়ে উঠা ইটভাটার মালিকরা সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাকি দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবশগত ভাবে প্রতিনিয়ত হুমকির মূখে পড়ছেন। বিএসটিআই’র বরিশাল আঞ্চলিক অফিসের সহকারী পরিচালক ও অফিস প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হান্নান, উৎকোশের বিষয় তিনি কিছু জানেন বলে দাবী করেন। পাশাপাশি তিনি আরো বলেন, অবৈধভাবে গড়ে উঠা ইটভাটার মালিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোঃ আবদুল হালিম উৎকোশের বিষয় অস্বিকার করে তিনি বলেন অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নোটিশ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে তিনি বাবুগঞ্জ দোয়ারিকা এলাকার ৫টি ইটভাটাকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বরিশাল সদর এর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর সহকারী পরিচালক দপ্তরের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মোঃ আবু ইউসুফ পান্না বলেন, নিজেদের অপরাধ অন্যের কাধে দেয়ার জন্য ইটভাটার মালিকরা এমন মন্তব্য করেছেন বলে তার দাবী। তবে অবৈধ ইটভাটা বিরোধী অভিযান ধারাবাহিকভাবে চলবে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোজাম্মেল হক চৌধুরী।