মুলাদী পুলিশকে সাথে নিয়ে ড্রেজার বাণিজ্য!

0
74
sdr

এম. লোকমান হোসাঈন ॥ ক্ষমতার লোভে মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দিয়ে চরাঞ্চলের মানুষের সাথে বছরের পর বছর প্রতারণা করে আসছে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা! দখিনার হিজলা-মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ এলাকার সহজ-সরল মানুষের প্রাণের দাবি ছিল নৌকা বা লঞ্চ নয়, সড়ক পথে বরিশাল শহরসহ দেশে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করার ব্যবস্থা করা। কারণ প্রতিবছর কম-বেশী লঞ্চ ও নৌকা ডুবিতে প্রাণ খোয়াতে হয় মানুষের।

এই দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে বছরের পর বছর আন্দোলন করে আসছিল এই এলাকার বাসিন্দরা। নদীমাতৃক দেশ বরিশাল। বরিশাল জেলার সবচাইতে অবহেলিত মানুষগুলো হচ্ছে হিজলা-মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জের কয়েক লাখ পরিবার। নেতারা নির্বাচনের সময় শুধু প্রতিশ্র“তি দিয়ে ক্ষমতায় এসে তাদের প্রতিশ্র“তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। সর্বশেষ ২০১৫ সালে ক্ষমতায় আসীন হয়ে বর্তমান সরকার তাদেও প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাচ্ছে। যার অংশ হিসেবে ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য একটি ব্রিজের কাজ শুরু হয় মুলাদীতে। ব্রিজটি মুলাদী-কুতুবপুর, ভায়া নাজিরপুর জিসি সড়ক প্রর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে।

ব্রিজের এপ্রোচ সড়ক নির্মাণে বালু ভরাটের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় বাবুগঞ্জ থানাধীন বাসিন্দা ও আল-রাফি এন্ড আরাফাত এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটার মোঃ ফিরোজ মাহমুদ ও মুলাদী থানাধীন বাসিন্দা মেসার্স নিপা ট্রেডিং কর্পোরেশনের প্রোপাইটার মোঃ ফয়সালকে। বালুখেকো মুলাদীর নাজিরপুর এলাকার সাহেবেরচরের বাসিন্দা আইউব আলী সিকদারের ছেলে দুলাল সিকদার, শাহ আলম সিকদারের ছেলে ফয়সাল সিকদার, সিরাজ সিকদারের ছেলে মিলন সিকদার ও সুমন সিকদার নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন করছে। এরসাথে সুমন রাঢ়ী সহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ জড়িত বলে সূত্র জানিয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধের সাথে জড়িত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনকারী ড্রেজার ব্যবসায়ীদের সাথে স্থানীয় বড়-বড় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, পুলিশ জড়িত থাকায় বালু উত্তোলন প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, এভাবে ড্রেজার ব্যবসায়ীরা বালু উত্তোলন করলে মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ এলাকার স্বপ্নের ব্রিজটি হুমকির মুখে পড়বে। এতে স্থানীয়দের পাশাপাশি সরকারও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মুলাদীর আড়িয়াল খাঁ নদীর উপর দিয়ে মুলাদী-কুতুবপুরে প্রায় ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে।

ব্রিজের দু’ই পাশ দিয়ে অথাৎ ২শ থেকে ৩শ গজ এলাকার মধ্যেই ব্রিজের এপ্রোচ সড়ক নির্মাণের জন্য বালু উত্তোলন করছেন কতিপয় বালুখেকোরা। এদিকে স্থানীয়দের চাপেরমুখে ড্রেজার ব্যবসায়ী ফিরোজ মাহমুদ ও ফয়সাল সামনে থেকে পিছু হঠলেও মুলাদী উপজেলার বালু ব্যবসায়ী ও ড্রেজার মালিক সাহেবেরচরের আইব আলী সিকদারের ছেলে মোঃ দুলাল সিকদার, সিরাজ সিকদারের ছেলে মিলন সিকদার ও সুমন রাঢ়ীকে সাথে নিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেই চলছে।

বরিশাল সহ দেশের বিভিন্ন যায়গায় সড়ক পথে যাতায়াত করার জন্য ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে হিজলা-মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের জন্য আড়িয়াল খাঁ নদীর উপর দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ ব্রিজটি। ব্রিজ নির্মাণের কাজে নিয়োজিত থাকা বালুখেকো খ্যাত ফয়সাল ও মোঃ ফিরোজ মাহমুদ। এই দুই বালুখেকো ক্রয় করে নয়, খোদ ব্রিজের ২শ গজ কাজ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। ব্রিজের কাছ থেকে বালু উত্তোলনের ফলে ইতিমধ্যে ব্রিজের আশপাশ এলাকায় ভাঙ্গন লেগেছে।

আর এভাবে বালু উত্তোলন করা হলে হিজলা-মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের স্বপ্নের ব্রিজটির কাজ সম্পূর্ণ করার আগেই নদীতে বিলিন হয়ে যাবে। ইতিপূর্বে বালুখেকোদের অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে স্থানীয় শতাধিক বাসিন্দা বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক বরাবর বালু খেকোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য গণস্বাক্ষরিত একটি আবেদন করেন। বিভাগীয় কমিশনার ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের মার্চ মাসের ১৪ তারিখ বরিশাল জেলা প্রশাসককে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ প্রদান করেন।

অপরদিকে মুলাদীর কাজীরচর সাহেবেরচর দাখিল মাদরাসা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও ২নং নাজিপুর ইউনিয়নের স্থানীয় শতাধিক বাসিন্দা একই বিষয় নিয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসকের নিকট একটি আবেদন করেন।

জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমানের নির্দেশে রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর মোঃ নাজমুল হুসাইন খাঁন স্বাক্ষরিত এক আদেশে মুলাদীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসারকে সরেজমিনে তদন্ততপূর্বক মাটি আইন ২০১০ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক জেলা প্রশাসক এর কার্যালয়কে অবহিত করার জন্য নির্দেশ করা হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও মুলাদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ জাকির হোসেন বরিশাল জেলা প্রশাসক দপ্তর থেকে (৩১.১০.০৬০০.১০৮.৬৬.০৪৪.১৮-৩৬১ নম্বর স্মারক) অভিযোগের বিষয় বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে তদন্ত করা হয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। গত মাসে জেলা প্রশাসক দপ্তরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে।

ওই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আরো বলেন, এ বিষয়ে গত মাসের ২৯ তারিখ মুলাদীর নাজিরপুর ইউনিয়নের কাজীরচর সাহেবেরচর দাখিল মাদরাসায় স্থানীয় গণ্যমাণ্যদের সঙ্গে বালু উত্তোলনে তাদের ক্ষয়-ক্ষতি সর্ম্পকে অবহিত বিষয়ক আলোচনা করা হয়েছে।

পাশাপাশি তিনি আরো বলেন, অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হবে।

তবে সময়ের বার্তা’র অনুসন্ধান বলছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কর্তৃক অভিযান পরিচালনার সংবাদ বালু খেকোরা অভিযানের পূর্ব থেকেই সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ ও উপজেলা নির্বাহী অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে জেনে যাওয়াতে বালুখেকোদের আটক কিংবা কোন ব্যবস্থা নিতে পারছেনা নির্বাহী অফিসার। এ কারণেই বছরের পর বছর বালুখেকোরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে।

পুলিশের সহযোগিতায় নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টিতে পুলিশের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে মুলাদী থানার ওসি জিয়াউল হক বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের সাথে ওসি এবং পুলিশের কোন সর্ম্পক নেই। এটা দেখভালেরও সম্পূর্ণ দায়িত্ব মুলাদী উপজেলার নির্বাহী অফিসারের।

উল্লেখ্য, এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখ আড়িয়াল খাঁ নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলনের সময় স্থানীয়রা বাঁধা প্রদান করার সময় মরধরের ঘটনা ঘটে। ড্রেজার ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে কামাল ফরাজী নামের একজনকে দিয়ে ছয়জনার বিরুদ্ধে একটি এজাহারনামায় লিখিত নিয়ে মুলাদী থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশ স্থানীয় একাধিক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় রাতভর নির্যাতন চালায়। পরের দিন এলাকাবাসীর চাপের মুখে তাদের ছেড়ে দেযা হয় ।

এদের মধ্যে ওই এলাকার বসু খাঁনের ছেলে নজরুল ইসলাম খাঁন, ফারুক খাঁনের ছেলে আনিচ খাঁন, মানিক খাঁনের ছেলে খোকন খাঁন, রত্তন খাঁনের ছেলে রফিকুল ইসলাম ও হারুন খাঁনের ছেলে ফরহাদ খাঁনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসনের কাছে এলাকাবাসীর জোড়দাবি, অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা হোক। রক্ষা করা হোক স্বপ্নের ব্রীজ, বাঁচুক আড়িয়াল খাঁ নদীও।