মুলাদী শ্বশুরকে স্বামী সাজিয়ে ভুমি অধিগ্রহণের অর্থ আত্মসাত, দেখুন ভিডিও সহ

0
171

এম. লোকমান হোসাঈন ॥ শশুর যখন স্বামী! দাদা তখন পিতা!! পাশাপাশি ভুয়া না-দাবী পত্র তৈরী। এমনকি প্রয়োজনের চেয়ে বেশী জমি অধিগ্রহণ করে অর্থ আত্মসাত চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। বরিশাল মুলাদী উপজেলার নাজিরপুর কাচিচর গ্রামের মরিয়ম বেগম ও স্থানীয় একটি চক্র জমি অধিগ্রহণের অর্থ এভাবেই উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন।

এদের সহযোগিতা করেছেন বরিশাল এল.এ শাখার কর্মকর্তারা। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে আসে সময়ের বার্তা’র অনুসন্ধানে। বরিশাল মুলাদী-কুতুবপুর আড়িয়াল খাঁ নদীর উপর দিয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যর ব্রিজ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেন এলজিইডি। জমি অধিগ্রহণের জন্য দায়িত্ব পালন করেন বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখার কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে দেখা যায় ২০১৫ সালের জুন মাসের ২৪ তারিখ যৌথ ভূমি তফসিল এর প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করেন বরিশাল এল.এ শাখার সাবেক সার্ভেয়ার (বর্তমানে বরিশাল সদর ভূমি সহকারী কমিশনারের কার্যালয় কর্মরত) মোহাম্মদ সেরাজুল ইসলাম ও আরেক সার্ভেয়ার মোঃ কামরুল হাসান ও এল জি ই ডি বরিশাল এর উপ-সহকারী প্রকেীশলী মোঃ ওবায়দুল হক এবং সিনিয়র সহকারী প্রকেীশলী মোহাম্মদ রাসেক খান। প্রতিবেদনের ২০ নং ক্রমিকে ১১৩ নং খতিয়ানের ৬০৯ নং দাগের মোট ৪৮ শতাংশ জমি থেকে ১০ শতাংশ বাগান ও ২২ শতাংশ নাল মোট ৩২ শতাংশ ব্রিজ নির্মান কাজে ব্যবহারের জন্য অধিগ্রহণ করার প্রতিবেদন জমা দেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে।

উক্ত ৩২ শতাংশ জমিতে ঘর বাড়ী, পুকুর, গাছ পালা ও ফসলের বিবরণ ঘরে উল্লেখ করা হয়েছে, মেহগনি গাছ ৬টি, চাম্বুল গাছ ১৫টি, রেইনট্রি গাছ ৪টি,নারিকেল গাছ ৫টি, তুলা গাছ ১টি, বাশঝাড় ১টি ও অস্পষ্ট আরো ১টি গাছ দেখানো হয়েছে। এসময় উক্ত প্রতিবেদনে জমির মালিক দেখানো হয়েছে রাশেদ গং পিতাঃ মৃত আঃ মজিদ ও রুস্তুম পিতাঃ মৃত জেন্নাত আলীকে। এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার প্রায় ২বছর পর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ফেব্র“য়ারী মাসের ২২ তারিখ স্থানীয় চেয়ারম্যান আবু হাসানাত জাপান ও সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার কামরুন নাহারের সুপারিশকৃত স্বাক্ষর নিয়ে অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন করার আবেদন করেন কালু হাওলাদারের ছেলে মৃত্যু মজিবর হাওলাদারের মেয়ে মরিয়ম বেগম।

আবেদনে মরিয়ম বেগম উল্লেখ করেন, এল এ কেস নং ০৭ এর মাধ্যমে ৬০৯ নং দাগের সম্পত্তির ওয়ারিশ ও দলিল মূলে মালিক বিদ্যমান থাকিয়া ক্ষতিপূরণের ধার্যকৃত জমি, ঘর, গাছ ও পুকুর ইহার অর্থ উত্তোলন করিতে পারেন সেই মর্ম্মে বরিশাল ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা বরাবর একটি আবেদন করেন। যাহার এল এ কেস ০৭/১৪-১৫। আবেদন পত্রে মরিয়ম বেগম ওয়ারিশ সনদপত্র ও একটি না-দাবী পত্র / ক্ষমতা পত্র দাখিল করেন। সেখানে মরিয়ম বেগম সহ মোট ৬ জনকে ওয়ারিশ দেখায়। যথা মরিয়মের ভাই মোঃ জাকির হোসাইন, মোঃ রাসেদ, মোঃ রাজীব, মোঃ সজীব হোসেন ও মরিয়ম ও মরিয়মের মা হালিমা বেগম। ওয়ারিশ সনদপত্রে স্থানীয় বাসিন্দা (১) মোঃ হান্নান মাতুবক্ষর পিতাঃ মৃত মোঃ সামচুল, (২) মোঃ নুরুল হক হাওলাদার, পিতাঃ মৃত আমজেদ হাওলাদার, (৩) আব্দুস ছালাম আকন পিতাঃ মৃত আকফত আলী আকন (৪) গ্রাম পুলিশ মোঃ আকবর এবং ইউপি সদস্য কামরুন নাহার (মায়া)’র তদন্ত প্রতিবেদন সাপেক্ষে উক্ত ওয়ারিশ সনদপত্র প্রদান করেন ২নং নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাসানাত জাপান। অন্যদিকে না-দাবী পত্র বা ক্ষমতা পত্রে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যর পাশাপাশী স্থানীয় বাসিন্দা নর্ব ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি ও বিতকির্ত হাইব্রিড

নেতা সাইফুল ইসলামও স্বাক্ষর করেন। প্রকৃতপক্ষে কালু হাওলাদারের সম্পত্তির ওয়ারিশ সূত্রে জমির মালিক ছেলে মজিবর হাওলাদার ও দুই মেয়ে কুটি বাণু ও নুরিয়া বেগম। এদিকে সরজমিনে গেলে বেড়িয়ে আসে আরো চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য। মরিয়ম বেগমের না-দাবী পত্রের অনুসন্ধান করে দেখা যায় মজিবরের ছেলে অথাৎ মরিয়মের আপন বড় ভাই জাকির হোসেন প্রায় ১৩ বছর পর্যন্ত দেশের বাহিরে বসবাস করে আসছেন। পাশাপাশী আরো ২ ভাই রাজীব ও সজিব হোসেনও প্রায় ৪ বছর পর্যন্ত দেশের বাহিরে অবস্থান করছেন। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী কোন ব্যক্তির সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলে উক্ত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণের টাকা তার আত্মীয়-স্বজন উত্তোলন করতে ইচ্ছুক হলে জেলা প্রশাসক এর বরাবর আবেদন করতে হবে। জেলা প্রশাসক উক্ত আবেদন পত্র সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থানরত দুতাবাসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতে ক্ষতিপূরণ দাবিদার মালিক যিনি তাকে যাচাই-বাচাই করে না-দাবী পত্রে স্বাক্ষর ও সুপারিশ করার ব্যবস্থা করবেন। দেশের বাহিরে থাকা ভাইদের তথ্য গোপন রেখে একটি ভুয়া না-দাবী পত্র দাখিল করেন মরিয়ম বেগম ও ওয়ারিশ পত্রে সুপারিশকৃত এই চক্রটি। এদিকে মরিয়মের আবেদনকৃত তথ্য সঠিক আছে কিনা সে বিষয়ে ২০১৭ সালের জুলাই মাসের ৬ তারিখ যাচাই-বাছাইর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যলয়ের এল এ শাখার সাবেক সার্ভেয়ার ও (বর্তমান কর্মস্থল উজিরপুর ভুমি অফিস) মোঃ নজরুল ইসলাম এবং এল এ শাখার সাবেক সার্ভেয়ার (বর্তমান কর্মস্থল বাকেরগঞ্জ ভুমি অফিস) মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন। যাহার মিসকেস

নং-০৩/১৭-১৮। প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীর ও নজরুল ইসলাম ১১ নং কাচিচর মৌজার এস এ ১১৩ নং খতিয়ানে ৬০৯ নং দাগের ষোল আনা অংশ অথাৎ ৪৮ শতাংশ ভূমির রেকর্ডীয় মালিক কালু হাওলাদার উল্লেখ করেন। কালু হাওলাদার মৃত্যুবরণ করিলে উক্ত সম্পত্তির ওয়ারিশ দেখানো হয়েছে ৪ ছেলে মোঃ জাকির হোসেন (২) মোঃ রাসেদ (৩) মোঃ রাজীব হোসেন (৪) মোঃ সজিব হোসেন ও মেয়ে মরিয়ম বেগম এবং স্ত্রী হালিমা বেগমকে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কালু হাওলাদারের ওয়ারিশ হচ্ছেন, মজিবর হাওলাদার ও ২ মেয়ে কুটি বাণু এবং নুরিয়া বেগম। যাদেরকে কালু হাওলাদারের ছেলে, মেয়ে ও স্ত্রী দেখানো হয়েছে। মূলত তারা কালু হাওলাদারের ৪ নাতী ১ নাতনি ও ১ পুত্রবধূ। তদন্ত প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেন আবেদনকারীর রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় প্রস্তাবিত জমি নিয়ে কোন দেওয়ানী মোকাদ্দমা চলমান দেখা যায় না। দাখিলকৃত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সঠিক আছে মর্মে প্রতিয়মান হয়। এই মর্মে জাহাঙ্গীর ও নজরুল

ইসলাম একটি প্রতিবেদন জমা দেন এল এ শাখায়। এমনকি নাম ঠিকানার পাশাপাশী অধিগ্রহণে বাড়তি জমি দেখানো হয়েছে। যেখানে ব্রিজ নির্মানের জন্য ৬০৯ নং দাগ থেকে ১৭ থেকে ১৯ শতাংশ জমি প্রয়োজন। সেখানে জমি দেখানো হয়েছে ৩২ শতাংশ। বাকী প্রায় ১৩ শতাংশ জমি ও বাড়তি গাছ-পালা দেখিয়ে উত্তোলন করা হয়েছে অতিরিক্ত অর্থ। যার মধ্যে নাল জমি ২২ শতাংশর উৎসব কর ছাড়া ৫লাখ ২৬ হাজার ৩শত ১৩ টাকা ৭০ পয়সা ও বাগান ১০ শতাংশ দেখিয়ে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪ টাকা ৪৫ পয়সা এবং গাছ পালার ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪০ হাজার ৬শত ৬২ টাকা ৪৮ পয়সা অথাৎ মোট জমি ও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ মোট ৮ লাখ ৬৬ হাজার ১০ টাকা ৬৩ পয়সা এল.এ চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করেছেন মরিয়ম বেগম। সরজমিনে গিয়ে মরিয়মের দেয়া ঠিকানায় মরিয়মকে পায়া যায়নি।

তবে মরিয়মের মা এবং ভাই রাসেদকে দেখাগেছে। মরিয়মের মায়ের কাছে উক্ত বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন করছি। ছেলেরা কোথায় থাকেন এমন প্রশ্নে হালিমা বলেন বড় ছেলে জাকির প্রায় ১৩ বছর পর্যন্ত দেশের বাহিরে থাকেন। ২ রাজিব ও সজিব প্রায় ৪ বছর পর্যন্ত তারাও দেশের বাহিরে থাকেন। টাকার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা টাকা একা খাই নাই। অপরাধ করলে সবাই করছে। টাকার ভাগ সবাই নিছে। সমস্যা হলে সবার হবে। আমি কেন একা সমস্যায় পরবো। আমি মাত্র ৮লাখ টাকা পাইছি।

টাকার ভাগ কাদেরকে দেয়া হয়েছে জানতে চাইলে হালিমা বলেন,যারা টাকা উঠাতে সহযোগিতা করছেন তারা সবাই ভাগ নিছেন। তবে কত টাকা ভাগ হয়েছে সে বিষয় কিছু বলেন নাই হালিমা বেগম। উক্ত অনিয়মের বিষয় জানতে চাইলে প্রথমে অস্বিকার করেন অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা পরিতোষ চন্দ্র দে। তবে এই কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত কিছু প্রমান দেখালে উক্ত বিষয় কোন জবাব দিতে পারেন নাই। মুলাদী উপজেলার ২নং নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাসানাত জাপান বলেন, না-দাবী পত্র/ক্ষমতা পত্র এবং ওয়ারিশ সনদপত্রর বিষয় স্থানীয় কাচিচর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মোঃ হান্নান মাতুবক্ষর এর সুপারিশে দেয়া হয়েছে। সুপারিশের সময় হান্নানকে বলা হয়েছে অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে মাদ্রারাসার এড়িয়াতে মাদক মুক্ত রাখার জন্য সিসি ক্যামেরা ক্রয় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় ইউপি মহিলা সদস্য কামরুন নাহার বলেন, চেয়ারম্যানের নির্দেশে গ্রাম পুলিশের সুপারিশ পত্রে স্বাক্ষর করা হয়েছে।

এল এ শাখার সাবেক সার্ভেয়ার (বর্তমান উজিপুর উপজেলা ভুমি অফিসের সার্ভেয়ার) নজরুল ইসলাম এর কাছে জানতে চাইলে সঠিক কোন জবাব দিতে পারেন নাই। আরেক এল এ শাখার সাবেক সার্ভেয়ার (বর্তমান বাকেরগঞ্জ উপজেলা ভুমি অফিসের
সার্ভেয়ার) জাহাঙ্গীর হোসেন তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলে ফোন কেটেদেন। সময়ের বার্তার অনুসন্ধানে আরো দেখা যায়, মুলাদী উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়ন এর কাচিচর গ্রামের বাসিন্দা ফরমান হাওলাদারের ছেলে কালু হাওলাদার মৃত্যু কালীন ১ ছেলে ২ মেয়ে রেখে যায়। সম্পত্তি রেখে যায় প্রায় ১একর ২৬ শতাংশ। ইউনিয়ন ভুমি অফিসের তথ্য মতে মুলাদী উপজেলাধীন জেএল ১১ নং কাচিচর মৌজার ৬০৯ নং দাগে ৪৮ শতাংশ, যার মধ্যে ছেলে কালু হাওলাদার ২৪ মেয়ে কুটি বাণু ১২ ও আরেক মেয়ে নুরিয়া বেগম ১২ শতাংশ করে ওয়ারিশ সম্পত্তি ভাগে পায়। এছাড়া ৬১০ নং দাগের ১৩ শতাংশ জমির কালুর ছেলে পেয়েছেন সাড়ে ৬ শতাংশ ২ মেয়ে পেয়েছেন বাকী সাড়ে ৬ শতাংশ ও ৬১১ নং দাগের ৬৫ শতাংশর জমি থেকে ছেলে সাড়ে ৩২ ও ২ মেয়ে পেয়েছেন বাকী ৩৩ শতাংশ।

অথাৎ কালু হাওলাদারের সম্পত্তির পরিমান ১ একর ২৬ শতাংশ। আনিত অভিযোগা ২ নং ওয়ার্ড এর সাবেক ইউপি সদস্য মোঃ হান্নান মাতুবক্ষর ও মোঃ নুরুল হক হাওলাদার এর কাছে জানতে চাইলে সঠিক কোন জবাব দিতে পারেন নাই। সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে তদবীর করে একপর্যায় নানান ভাবে হুমকি-ধামকি প্রদান করেন।