মৎস টুটুলের নেতৃত্বে দক্ষিণাঞ্চলের জাটকা পাচার

0
160

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট || মৎস অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত। গণমাধ্যমে বারবার দাবী করা হচ্ছে, জাটকা নিধন রোধে তারা জিরো টলারেন্স। তারপরও বরিশালের আড়ৎগুলো জাটকায় সয়লাব। প্রকাশ্যে চলে দর কষাকাষি আর নগদ টাকায় বিক্রি। শুধুমাত্র বরিশালের কয়েকটি আড়ৎ থেকে দৈনিক কয়েক হাজার মণ জাটকা বিক্রি হয়ে যায় অবলিলায়।

নাম প্রকাশ না করলেও প্রশাসনের কতিপয় কর্তা ব্যাক্তির দাবী স্থানীয় প্রভাবশালীদের দাপটের সামনে তারা অনেকটা অসহায়। আবার জাটকার ব্যবসা যারা করেন তাদের দাবী কোন চাপ নয়, প্রশাসন ম্যানেজ করেই তারা জাটকা পাচার/ব্যবসা করে আসছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, মাত্র চারদিন ধরে বরিশালের আড়তে জাটকা তুলতে পারছে না পাচারকারী চক্র।

এর কারন, পাচার চক্রে ভুল বোঝাবুঝি চলছে। আর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে জাটকা পাচার বা পাচারকারীদের ধরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করে থাকেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল। তিনি যখন চান তখন জাটকা (বা তারও ছোট সাইজের) মাছ আড়তে বিক্রি হয়। এখন তিনি বিক্রি বন্ধ রাখতে বলেছেন বলে আমরা বিক্রি বন্ধ রাখছি-এমনটাই দাবী করেছেন পাচারকারী একজন।

আর মৎস অধিদফতর সূত্র দাবী করেছে, বরিশালের যতগুলো আড়ৎ রয়েছে সেখানেই প্রশাসনের চোখের আড়ালে জাটকা বিক্রি হয়ে থাকে। এর মধ্যে জাটকার সবচেয়ে বড় মোকাম বরিশাল পোর্ট রোডস্থ রসুলপুর মৎস অবতরণ কেন্দ্র। এরপরপরই রয়েছে তালতলী খেয়াঘাট, মীরগঞ্জ বাজার, বরগুনার পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও মেহেন্দীগঞ্জ।

এছাড়াও অল্পবিস্তর অন্যান্য স্থান থেকে জাটকা পাচার হয়ে থাকে। জানা গেছে, বরিশালে চারটি চক্র সবচেয়ে বেশি জাটকা পাচার করে থাকে। এদের মধ্যে তালতলীর চক্রটির সাথে সম্প্রতি নিরব হোসেন টুটুলের বনিবনা না হওয়ায় তাদের চালান কাউনিয়া থানা পুলিশ ও মৎস অধিদফতর বরিশাল আঞ্চলিক অফিসের কাছে ধরিয়ে দেন আ’লীগের এই নেতা। এমনকি জাটকা জব্দের কারনে কাউনিয়া থানা পুলিশকে মিষ্টি পাঠিয়ে অভিনন্দন জানান টুটুল। কাউনিয়া থানা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টুটুলের কথামত অবিযান পরিচালনা করা হলে মিষ্টি পাঠায় তিনি।

আর বর্তমানে তালতলীর যে গ্রুপটির সাথে ‘বনিবনা’ না হওয়ায় তাদের জাটকা তুলতে দিচ্ছে না এমন দাবী করেছেন তারা হলেন, মিরাজ শিকদার, নাঈম, কালু সিকদার, শাকিল, সবুজ হাওলাদার ও সেলিম। জাটকা পাচারকারী এই কালু চক্র তালতলী হারুন ওরফে ডাইল হারুনের ঘাট, কাগাশুরা এবং জিটিএল বা লাবু মিয়ার ইটের ভাটার পাশ থেকে জাটকার চালান তুলে থাকে।

অনুসন্ধানী সূত্র বলছে, জাটকা পাচার করে এরা পত্যেকেই দুই/তিনটি করে বাড়ির মালিক হয়েছেন। ইলিশের মৌসুমে এরা জাটকা পাচার এবং ইলিশের মৌসুম মেষ হলে চিংড়ির রেনু পোনা ধরিয়ে পাচার করে থাকে। এদের সাথে মৎস অধিদফতর, নৌ-পুলিশ এবং কাউনিয়া থানা পুলিশের সখ্যতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মার্চ মাসের শেষে নিরব হোসেন টুটুলকে চাহিদা মত টাকা দিতে না পারায় সকালে সেলিমের জিম্মায় থাকা ৫০০ কেজি জাটকা এবং সন্ধ্যায় ৬ ড্রাম জাটকা উদ্ধার করে মৎস অদিদফতর ও থানা পুলিশ। এই একই ভাবে অন্যান্য পাচারকারী চক্র কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে বরিশালের ৬ জেলার মৎস আড়ৎ এক রাজনৈতিক নেতার বিশেষ প্রভাবে নিয়ন্ত্রনে যায় নিরব হোসেন টুটুলের। এরপর থেকে ভাল-মন্দ সবকিছুই এই নেতার করায়ত্ব।

বরিশাল মহানগর আ’লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল বলেন, তালতলীর কোন জাটকা ব্যবসায়ীর সাথে আমার কোন পরিচয় নেই। তাদের আমি চিনি না। তারা যে অভিযোগ করেছেন তা ভূয়া। টুটুল আরও বলেন, অন্যান্য আড়তের বিষয়ে জানি না। আপনারা দেখবেন পোর্ট রোডে কোন জাটকা বিক্রি হয় না।

তালতলীতে জাটকা পাচার চক্রের হোতা কালু (২ এপ্রিল সোমবার) বলেন, তিনদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলে জাটকা কেনা-বেচা বন্ধ। আমাদের নেতা নিরব হোসেন টুটুল যখন বলেন তখন আমরা ব্যবসা চালাই। তিনি যখন বলেন ব্যবসা চলবে না, আমরা ব্যবসা বন্ধ রাখি। পাচার চক্রের অপর এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি নাখোশ হলে আমরা না খেয়ে থাকব। আমারা যদি অপরাধ করি তাও তিনি দেখেন। আবার সুখের দিনেও তিনি পাশে থাকেন।

বরিশাল জেলা মৎস কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে বরিশালের সবগুলো মোকামেই জাটকা পাচার হয়। যারা পাচার করে তাদের সুনির্দষ্ট কোন নামের তালিকা আমাদের কাছে নেই। তবে আমরা যখনই কোন জাটকা নিধনের সন্ধান পাই অতিদ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এই কর্মকর্তা বলেন, পাচারকারীরা এত চালাক হয় যে যখন প্রশাসন থেকে অদিক কড়াকড়ি আরোপ করা হয় তখন আড়তেও নিয়ে আসে না। সরাসরি নদী থেকে পাচার করে দেয়।