যন্ত্রনাদায়ক অন্ধকার কারাগার, পর্ব ১

0
111

আল আমিন গাজী ॥ ছোট বেলা থেকেই আমি একটু চঞ্চল প্রকৃতির লোক ছিলাম। কোন ঘটনা শুনলেই সেই ঘটনার পিছনে থাকা ঘটনাকে খুঁজেবের করার জন্য অনুসন্ধান করতাম। আমি সাংবাদিকতা পেশায় মাত্র সাড়ে ৫বছর যাবৎ কর্মরত আছি।

বরিশালের বিভিন্ন স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাসহ ঢাকার জাতীয় সাপ্তাহিক ও একাধীক অনলাইন পত্রিকায় কর্মরত ছিলাম। চলার পথে বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি করেছিলাম। তবে চলার পথে ২/১জন সাংবাদিক এর সাথে সম্পর্ক গড়তে পারি নাই।

যাই হোক গত ৬মাস পূর্বে আমার যে পত্রিকা কাজ করি,সেই পত্রিকার বিরুদ্ধে বিজ্ঞআদালত একটি মামলা দায়ের করেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। সেই মামলায় কে কে আসামি ছিলো তা ও আমার জানা ছিলো না। হঠাৎ একদিন প্রশাসনের ৪ কর্মকর্তা আমার অফিসের ভিতর প্রবেশ করে। আমি তখন বরিশাল নগরী সম্পর্কে একটি সংবাদ লিখতে ছিলাম। তাদেকে দেখে বল্লাম বসেন চা খান। তারা বলে না আপনাকে আটক করতে এসেছি । আমি জিজ্ঞাসা করলাম আমার অপরাধ কি?

তারা প্রশ্নের উত্তরে বলেন,আপনি একটি মানববন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন তাই আপনাকে আটক করা হয়েছে। তখন তাদের কাছে আমার বিরুদ্ধে কোন ওয়ারেন্ট ছিলো না। আমি তখন হতভম্ব হয়ে বলি চলেন, তবে আমি কোন অপরাধ করি নাই। আমি তো চাকরি করি বেতন ভূক্ত কর্মচারী ।

যে ঝামেলা চলছে তা পত্রিকার কর্তৃপক্ষ সাথে। আমার সাথে কেন এরকম হবে। তারপর ও তাদের কথায় সম্মান দেখিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি। কারন আমি আইনকে কখনই অসম্মান করি নি। তখন তাদের মধ্যে একজন একটি হাতকড়া বের করে আমার হাতে পড়ায় । আমি তখন তাদের বলি আমাকে হাতকড়া পড়ানোর দরকার নেই। কিন্তু তারা আমার কথা না শুনে হাতকড়া পড়িয়ে অফিসের ৫ম তলা থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়। আমি সেই মূর্হুতে আমার সিনিয়র একাধীক সাংবাদিক কে ফোন করে বিষয়টি জানাই।

তারপর ও পুলিশ আমাকে নিয়ে গেল থানায়। থানায় গিয়ে জানতে পারি, থানায় আমাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা নাই । মামলা ছাড়াই আটক করেছে। তখন আমার সিনিয়র সাংবাদিকরা খবর পেয়ে থানায় হাজির হয়েছে। আমার মনের ভিতর তীব্র যন্ত্রণা ও অজানা আশঙ্কায় খুড়ে খুড়ে খাচ্ছে। সবাই চেষ্টা চালিয়েছে আমাকে ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমার কপাল খারাপ। বাসায় খবর পেল আমি আটক হয়েছি। মা বাবা আসলো থানায় মা কান্না করছে থানার বারান্দায়। আমিও কান্নায় ভেঙ্গে পরছিলাম । কারন কোন অপরাধ না করে দোষী হলাম।

যাই হোক তখন ভাবলাম হয়তো সবার চেষ্টায় আমাকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তা আর হলো না। রাতে সবাই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছে। রাতে আমাকে থানার গারদখানায় নেয়া হয়। গারদে ৪/৫জন আসামি ছিলো বিভিন্ন মামলার। সবাই একটি চটের উপরে দলামোচ করে ঘুমিয়ে আছে। আমি তখন মাথা নিচু করে বসে আছি । কান্না করতে ছিলাম । কারন আমার পরিবারে সবাই আমার উপর নির্ভশীল। রাতে থানার বিভিন্ন কর্মকর্তা গারদে আমাকে দেখতে আসে। আমি তখন আসামিদের কাতারে বসে আছি। মা-বাবা থানার বাহিরে বসে চিৎকার করে কান্না করতে ছিলো । আমি মায়ের কান্না শব্দ শুনতে পাচ্ছি। গারদে মশা বিভিন্ন পোকায় ভরা। রাথরুমের গন্ধ । সব মিলিয়ে এক অজানা যন্ত্রনা অনুভাব করতে ছিলাম।

রাত তখন সাড়ে ৩টা। গারদে বাকি আসামীরা শুয়ে আছে । তখন অনেক শীত। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি তবে এ রকম যন্ত্রণা দায়ক কষ্ট করি নি। গারদে বাকি আসামী একটি কম্বল শরীরে জড়িয়ে শুয়ে আছে। আমি শীতের ভিতর বসে আমার পরিবারে কথা চিন্তা করতে ছিলাম। আমাকে ছাড়া তারা কিভাবে চলবে। গারদে একদিকে মশার কামড়, অন্য দিকে ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিলাম । তখন রাত ৪টা ১৫মিনিট । চোখেও ঘুম হানা দিচ্ছে। বসে থাকতে থাকতে সকাল হয়ে গেল। থানায় আমার সহকর্মীরা একে একে জড়ো হতে লাগলো।

হঠাৎ থানায় এক পুলিশ সদস্য গারদ খুলে আমাকে বের করলে তখন মনে হয়েছিলো আমি এখান থেকে মুক্ত। কিন্তু না আমার ধারণা ভুল। আমাকে আবার হাতকড়া পড়িয়ে থানা থেকে বের করে আদালতে নিয়ে গেল।

পরে জানতে পারলাম, রাতে না সকালে থানায় মামলা হইছে। তবে কোর্টের গারদখানার অবস্থা একই রকম। তবে সেখানে প্রায় একটি রুমে ১৫/২০জন আসামি। কেউ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইয়াবা ব্যবসায়ী,চোরসহ বিভিন্ন মামলার আসামী।

হঠাৎ একটি ছেলে কোর্টগারদে ভিতরে বসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো ভাই আপনি তো সাংবাদিক আল আমিন গাজী। আমি লজ্জায় মুখে কথা না বলে মাথাটা নাড়া দিলাম। সেই লোকটি সহ বেশ কিছু ছেলেরা কথাটা শুনে কাছে চলে আসলো। এরপর নানা প্রশ্ন? আমি কি মামলায় আটক হলাম। তাদের প্রশ্নের উওর দিতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কোর্টগারদের দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা আমার পরিচিত । তারা আসামীদের প্রশ্ন গুলো শুনে তাদের বলে আল আমিন গাজী বিজ্ঞআদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচারে জড়িত আছে।

আমি অবাক হয়ে চেয়ে আছি ওই পুলিশ কর্মকর্তার দিকে। কারন প্রশাসন আমাকে কোন মামলার অজুহাত দেখিয়ে আটক করে তা তখনও আমি পরিস্কার ভাবে জানতে পারি নাই। আর আমি তো বেয়াদব না যে আদালতে উপেক্ষা করে কাজ করবো।তখন সময় প্রায় দুপুর সাড়ে ১২টা। কোর্টগারদে আমাকে দেখতে আমার পরিচিত বিভিন্ন পেশার মানুষ আসছে। আমাকে যখন কোর্ট গারদ খুলে আবার হাতে হাতকড়া পড়িয়েছে। তখন মনটা চমকে উঠলো। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। কারন থানায় আমার নামে কখনই কোন মামলা বা অভিযোগ ছিলো না।

গারদের এক পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে হঠাৎ বলে উঠলো আল আমিন গাজী ছোট ভাই তুমি যে মামলায় আসামি তোমার এই মামলায় ১ বছরেও জামিন হবে না। কারন মামলাটা বিজ্ঞআদালত পরিচালনায় থাকবে। এর মধ্যেই এক পুলিশ সদস্য নাম ধরে ডাক দিলো। আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম।

সে বলে উঠলো চলেন যেতে হবে। আমি বল্লাম কোথায়। সে বলে জেলখানায়। আমি কোর্টগারদ থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলাম । তখন মা-বাবা ও পরিবারের সবাই কান্না করতে ছিলো ।

আমি আর তাদের কান্না সইতে পারি নাই। এমন একটা পরিস্থিতির কোন দিন মোকাবেলা করতে হবে তা ভাবতে পারি নাই। আমার মা অসুস্থ নানা রোগে জড়জড়িত। মা -বাবাকে ছেড়ে কোন দিন পুলিশের জেল কাভারভ্যানে যেতে হবে তা কখনই কল্পনা করি নাই। হঠাৎ গাড়ি ছেড়ে দিলো। কিন্তু মায়ের মনতো, কোনদিন দূরে যেতে দেয়নি। আর মা বুকে কষ্ট নিয়ে ওই গাড়ির পিছনে দৌড়াতে লাগলো।

অতঃপর………