যেভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন বলিউড অভিনেত্রীরা

0
257
সময়ের বার্তা ।।

নিজেদের ‘বলিউড স্বপ্ন’ পূরণের জন্য প্রতিবছর হাজারো ভারতীয় তরুণ-তরুণী ভীড় জমায় দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ও চলচ্চিত্র রাজধানী মুম্বাইতে। কিন্তু অনেকের জন্যই শেষ পর্যন্ত এই স্বপ্নটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। অনেক অভিনেত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে পরিচালক বা কাস্টিং এজেন্টের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তারা।

বলিউড তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছয় বছর আগে সুজান্তা (ছদ্মনাম) নিজের মা-বাবাকে রাজি করিয়ে ভারতের একটি ছোট গ্রাম থেকে পাড়ি জমায় মুম্বাইতে। সে সময়ে তার বয়স ছিল ১৯। ছিল সামান্য অভিনয়ের অভিজ্ঞতা। কিন্তু কারো সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ ছিল না। তবে তাকে ইন্ডাস্ট্রিতে সুযোগ দিতে ইচ্ছুক- এমন মানুষের সাক্ষাৎ পেতে দেরি হলো না।

সুজান্তার প্রথম প্রস্তাবটি এসেছিল একজন কাস্টিং এজেন্ট থেকে। তিনি তাকে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে দেখা করতে বলেন। সুজান্তাও কিছু মনে করেননি। তিনি জানতেন, বাড়িতে গিয়ে এ ধরনের সাক্ষাৎ স্বাভাবিক বিষয়।

কিন্তু তার পর যা ঘটলো, সেটা ছিল খুবই বাজে অভিজ্ঞতা। সুজান্তা বলেন, ‘তিনি আমার শরীরের যেখানে ইচ্ছা সেখানেই স্পর্শ করছিলেন। তিনি আমার পোশাকের ভেতর সব জায়গায় তার হাত রাখেন। যখন এটি খুলতে ‍শুরু করেন, আমি তাকে থামাই।’

যখন সুজান্তা তাকে থামিয়ে দেন, ওই কাস্টিং এজেন্ট তাকে বলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার ‘সঠিক মনোভাব’ নেই তার। শুধু একজনই নয়; কাজের সুযোগ খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বহুবার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এ ধরনের যৌনতার শিকার হতে হয়েছে তাকে।

তিনি জানান, একটা ঘটনা জানানোর জন্য একবার পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু ‘ফিল্মের লোকের যা খুশি করতে পারে’ বলে পুলিশ কর্মকর্তারা তার অভিযোগ উড়িয়ে দেন।

এ ধরনের কথার কারণে ক্যারিয়ারে বিঘ্ন ঘটতে পারে- এমন ভয়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার জন্য বলেন সুজান্তা। যে এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে, মনে করা হয় প্রচারণা বা অর্থের জন্য সে এসব করছে। ফলাফল হয়, সুনাম ধ্বংস।

এই অভিনেত্রী জানান, চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগের বিনিময়ে যৌন সুযোগ দেয়ার ঘটনা ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সব সময়ই বিদ্যমান। ক্যারিয়ার ধ্বংসের ভয়ে কেউ নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে সাহস পায় না।

তবে যে কয়েকজন নিজের এই বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে প্রকাশ্যে এগিয়ে এসেছেন, তাদের একজন ঊষা যাদব। প্রায় এক দশক এই ব্যবসাতে আছেন তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া সত্ত্বেও এখনো অনাকাঙ্ক্ষিত যৌনতা দেয়ার প্রস্তাব পান এই অভিনেত্রী।

ঊষার প্রত্যাশা, তার অভিজ্ঞতার কথা শুনে অন্যরাও নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে এগিয়ে আসবে।

তিনি যখন প্রথম বলিউডে পা রাখেন, তাকে বলা হয়, এগিয়ে যেতে হলে পরিচালক বা প্রযোজকের শয্যাসঙ্গী হতে হবে তাকে। এই অভিনেত্রী তার অতীতের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তোমাকে আমরা কিছু দিচ্ছি, বিনিময়ে তোমার আমাদেরকেও কিছু দিতে হবে।’

ঊষা জানান, অনেক তরুণীরই রাজি হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তিনি বলেন, সবসময়ই যৌনতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। এ কারণে কিছু প্রযোজকসহ অন্যদের কাছ থেকে হুমকি পেতে হয়েছে।

ঊষা বলেন, ‘তিনি আমাকে অভিশাপ দিয়ে বলেন, তুমি কখনো কোনো ভালো চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পাবে না। তোমার জন্য ভালো কিছু নেই।’

রাধিকা আপ্তে নামে যৌন নিপীড়ন নিয়ে কথা বলা আরেক ভারতীয় চলচ্চিত্র তারকা জানান, বলিউডে অনেক কিছুর নির্ধারক হচ্ছে ক্ষমতা। যারা যৌন নিপীড়ন নিয়ে কথা বলেন, তাদের থামিয়ে দিতে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতা।

বলিউডের বেশিরভাগ তারকাই যৌন নিপীড়ন নিয়ে কথা বলতে না চাইলেও রাধিকা এ ব্যাপারে প্রকাশ্যেই কথা বলছেন। সম্প্রতি বলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমা প্যাডম্যানে অভিনয় করেছেন তিনি। পর্দায় ও পর্দার বাইরে নারী অধিকারের ব্যাপারে তাকে মনে করা হয় চ্যাম্পিয়ন।

রাধিকা বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করি। ইন্ডাস্ট্রিতে যেসব নারী এ ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভয় পায়, আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।’ বলিউডে ঢোকার ক্ষেত্রে সুযোগের অভাব যৌন নিপীড়নকে সহজ করে তুলেছে।

বলিউডে কাজ পাওয়ার বিষয়টি হলিউডের মতো না। এখানে কাজ করার জন্য দারকার হয় ব্যাপক ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগ এবং সৌন্দর্য। হলিউডে অভিনয় স্কুল ও মঞ্চের মাধ্যমে কাজ শুরু করতে হয় বলেও জানান রাধিকা।

তার প্রত্যাশা, হলিউডের মতো বলিউডেও ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ চালু হবে। তবে বড় বড় তারকারা এগিয়ে না এলে সেটা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন এই অভিনেত্রী।

বলিউডের আরো এক নামকরা তারকা যৌন নিপীড়নের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তিনি কালকি কোয়েচলিন। এর আগে শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের ব্যাপারেও প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন এই তারকা।

তিনি বলেন, ‘আপনি কিছুই না হলে লোকেরা আপনার কথা শুনবে না। যদি আপনি একজন সেলিব্রেটি হন, তাহলেই আপনার কথা হেডলাইন হবে।’

ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে শুধু বলিউড নয়; অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতেও একই অবস্থা। দেশটিতে আঞ্চলিক পর্যায়ে অনেক ইন্ডাস্ট্রি বিকশিত হচ্ছে। সেখানেও নারীরা যৌন নিপীড়ন নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন।

সম্প্রতি তেলেগু সিনেমার এক অভিনেত্রী প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলেছেন। প্রথমবার যখন তিনি এ নিয়ে কথা বলেন, তখন প্রচারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন- এমন অভিযোগে তাকে পাত্তা দেয়া হয়নি। এমনকি স্থানীয় শিল্পী সমিতি তাকে নিষিদ্ধ করে। পরে ভারতের মানবাধিকার সংস্থার হস্তক্ষেপে তা প্রত্যাহার করা হয়। এসব ঘটনা খতিয়ে দেখতে তেলেগু ইন্ডাস্ট্রিতে একটি কমিটিও করা হচ্ছে।

এর আগে ২০১৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে বলিউডে যৌন নিপীড়ন নিয়ে কথা বলেছেন রণবীর সিং। বলিউডে খুব কম পুরুষই এ নিয়ে কথা বলেছেন। তাদের একজন তিনি। যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে তিনি একটি সংগঠনও তৈরি করেছেন।

বলিউড অভিনেত্রীরা মনে করেন, ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ একটি উপায়। তবে নিরাপদে অভিযোগ জানানোর মতো একটি স্থান না থাকলে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারবে না ইন্ডাস্ট্রি।