রাজাকারের অভিভাবক ছিলেন অমৃত লাল দে!

0
1286

বরিশাল অফিস॥
অমৃত লাল দে। দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষা প্রসারে যার রয়েছে অসামান্য অবদান। একই সাথে তার সংগ্রামী জীবন এখন অনুকরনীয়-অনুসরনীয়। শিক্ষা ও সংগ্রামী জীবনী নিয়ে অনেক গবেষণাধর্মী বই বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। গুনগান করছেন বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক ব্যাক্তিরা। কবিরা লিখেছেন এই মানুষটিকে নিয়ে স্তুতিমূলক কবিতা। অনেকে আবার দেবতার আসনে বসিয়ে পূজা করতেও ছাড়ছেন না।

অর্থাৎ দক্ষিণবঙ্গের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্তের অধিকারী অমৃত লাল দে। তবে তার জীবদ্দশার সকল সময়ের আলোচনা চোখে পড়লেও একটি বিষয় থেকে কৌশলে নিজেদের লেখনী আড়াল করেছেন লেখক ও আলোচকরা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ে অমৃত লাল দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাবার যে দৃঢ় মানসিকতা দেখিয়েছেন তা সর্বাত্মকভাবে আলোচিত এবং প্রশংসনীয়।

কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অমৃত লাল দে ও তার প্রতিষ্ঠানের কি ভূমিকা ছিল সে বিষয়ে নূন্যতম কোন বর্ণনা নেই। তাহলে কি ভয়াল একাত্তুরে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর কোন ভূমিকা ছিল না? এমন প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। একই সাথে এও স্বাভাবিক যদি তিনি বাঙালীদের সহায়তা না করে হলেও পাকিস্তানীদের সহায়তা করেননি। কিন্তু ইতিহাসের পর্যবেক্ষণ বলছে ঠিক তার উল্টো কথা।
মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, বাঙালীদের যেমন তিনি সহায়তা করেননি তেমনি মিলিটারীদেরও সহায়তা করেননি।
তবে যুদ্ধ পরবর্তী
সময়ে
রাজাকারদের
আশ্রয় দিয়েছিলেন এই দানবীর ও শিক্ষা বিস্তারকারী ব্যাক্তিটি। শুধু অমৃত লাল দে নয়, অমৃত গ্র“পের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ। জানা গেছে,
গণহত্যাকারী রাজাকারদের ধরে নেবার জন্য যেসব মুক্তিযোদ্ধা এসেছিলেন তাদের প্রতিহত করেন তিনি এবং তার কারনে কয়েকজন রাজাকার রক্ষা পান। এমনকি রাজাকারদের ব্যবহার করেই অগ্রসর হয়েছেন অমৃত লাল দে।

১৯৭১ বা তার পূর্ববর্তী সময়ে পৃথিবীর ২য় কলকাতা হিসেবে জৌলুস নিয়ে যে বন্দরটি ব্যবসায় জমজমাট ছিল সেটি সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী নলছিটি উপজেলার বর্তমান ফেরীঘাট এলাকা। নলছিটির ধনাঢ্য হিন্দুদের গণহত্যা করা হয়েছিল এই নদীর তীরেই। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলছে, ১১ মে, ১৩ মে, ১৩ নভেম্বর এবং ১৭ নভেম্বর ধরাবাহিকভাবে নলছিটিতে গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী।

নলছিটি উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সেকান্দার আলী মিয়া বলেন, পাক বাহিনীর দোসর রাজাকার-আলশামস্ বাহিনী সনাক্ত করণের

কাজ করে বেছে বেছে নলছিটির হিন্দু ও স্বাধীনতাকামীদের ধরে নিয়ে যেত। পরে নির্ধারিত তারিখ মত মিলিটারী এসে হত্যা করতো। মিলিটারী চলে যাবার পর লাশগুলো নদীতে ভাসিয়ে দিত স্থানীয় দোসররা। তিনি বলেন, নলছিটিতে গণহত্যার প্রধান দুজন হলেন আমীর হোসেন গাজী ও তার জামাতা ইউসুফ আলী খান ওরফে ইউসুফ দাদু।
বরিশালে ইউসুফ দাদুকে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হিসেবে জানে। দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে আলোচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার প্রজেক্ট কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন। প্রখ্যাত গবেষক দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী’র প্রণীত ‘অমৃত লাল দে’ বইয়ের ৫৪ নং পৃষ্ঠায় এমন তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

১৯৯২ সালের ২ জুন অমৃত লাল দে কলেজ প্রতিষ্ঠার যে অর্গানাইজিং কমিটি গঠন করা হয় সেখানে ছিলেন ইউসুফ আলী খান এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের একজন অন্যতম কর্ণধার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তিনি। রাজাকার ইউসুফ আলী খানকে নিয়ে গঠিত এই কমিটিতে ছিলেন সাদা মনের মানুষখ্যাত বিজয় কৃষ্ণ দে’ও। এমনকি অমৃত লাল দে কিন্টারগার্টেনের পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। জানা গেছে, রাজাকার ইউসুফ আলী খান ও তার শ্বশুর আমীর হোসেন গাজীর নেতৃত্বে নলছিটিতে ২২ সদস্য বিশিষ্ট শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন আমীর আলী গাজী ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইউসুফ আলী খান।

১৯৭১ সালের ১১ মে রাতে নলছিটির শান্তি কমিটির জরুরী সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ওই শহরের ১২ জন ব্যবসায়ীকে থানায় ডেকে নিয়ে আটক করা হয়। আটককৃত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা স্বাধিনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করছিলেন। ওই ব্যবসায়ীদের সনাক্তকরণে কাজ করেছেন ইউসুফ আলী খান ওরফে ইউসুফ দাদু ও তার শ্বশুর আমীর আলী গাজী। একইসাথে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী ব্যবসাীয়দের থানায় ডেকে নিয়ে আসেন ইউসুফ আলী খান।

১৩ মে ইউসুফ আলী খান থানা থেকে আটককৃতদের এক রশিতে বেঁধে সুগন্ধ্যা নদীর তীরে নিয়ে যান। সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ীদের। ‘হত্যার নির্দেশদাতা ছিলেন ইউসুফ আলী খান’ বলেন এক রশিতে বেধে যাদের গুলি করা হয়েছিল সেখান থেকে বেচে যাওয়া ব্যবসায়ী খিতিশ চন্দ্র দত্ত। এখানে হত্যা করা হয়, হরিপদ রায়, কার্তীক ব্যানার্জী, কেষ্টমোহন নন্দী, নেপাল কুড়ি, শ্যামাকান্ত রায়, অতুল কুড়ি, দশরথ কুন্ডু, সুকুমার বনিক ও ভাসান পোদ্দারকে।

জনকণ্ঠকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যুদ্ধাহত এই খিতিশ চন্দ্র দত্ত বলেন, ইউসুফের নির্দেশে মিলিটারীরা যে গুলি করেছিল তা তার বাম পাশের বু ভেদ করে বেড়িয়ে গিয়েছিল। কালী বাড়ি রোডের ইউসুফ আলী খানের বাড়িতে মিলিটারিদের অস্থায়ী ক্যাম্প ও বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল। সেখানে নলছিটির অনেক তরুনীতে ধরে নিয়ে আসতো ইউসুফ দাদু। মিলিটারীরা যাদের গণধর্ষণ করতো। একইভাবে মিলিটারীদের গানবোটে সুন্দরী বাঙালী ও হিন্দু মেয়েদের তুলে দিত সে।

জানা গেছে, গানবোটে ইউসুফের দেয়া নারীদের ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিত পাকবাহিনী। ১৩ নভেম্বর চাচৈরে যে গণহত্যা হয় সেখানেও সেতৃত্ব দেন ইউসুফ ও আমীর গাজী। ১৭ নভেম্বর পরমপাশায়ও ইউসুফের ধরে আনা ৪ জনকে হত্যা করা হয়। প্রতক্ষ্যদর্শী মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছে, ইউসুফ, আমীর গাজী ও খাটো রব নদীর তীর ধরে পথ দেখিয়ে মিলিটারীদের নিয়ে যেতেন। এভাবে কয়েকশ’ বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করতেন তারা। অগ্নিগংযোগ ও হত্যার পর লুটতরাজ করে সম্পদ নিয়ে আসতেন পিস কমিটির এই নেতারা।
জানা গেছে, দেশ স্বাধীন হবার পরে নলছিটি ত্যাগ করে ইউসুফ আলী খান ও তার শ্বশুর আমীর আলী গাজী। আমির আলী গাজীর বরিশালস্থ (গুপ্ত কর্ণারের বিপরীতে গাজী মিলনায়তন) বাড়িতে বসবাস শুরু করে। যদিও স্বাধীনতার পূর্বে থেকেই আমীর আলী গাজীর সাথে সখ্যতা ছিল অমৃত লাল দে’র। সেই সখ্যতার সূত্রে বরিশালে আশ্রয় পায় এরা।

নলছিটির মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সেকান্দার আলী মিয়া বলেন, দেশ স্বাধীনের পর আমরা নলছিটিতে রাজাকারদের একটি তালিকা করি। তালিকা অনুসারে বেশ কয়েকজনকে ধরে আনলে স্থানীয় জনতা তাদের মেরে ফেলে। তেমনি নলছিটির পিস কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী খান ও আমীর আলী গাজীকে ধরে আনতে বরিশালে যাই। কিন্তু অমৃত বাবু তাদের আশ্রয় দেয় এবং জামাই শ্বশুরকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দেন। ফলে তাদের ধরে আনা সম্ভব হয়নি।

১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দৃশ্যমান কোন কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন না এই রাজাকারেরা। তবে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর আবার প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন তারা। জানা গেছে, অমৃত লাল দে ও বিজয় কৃষ্ণ দে’র প্রকাশ্য আশ্রয়ে আবার মাথাচড়া দিয়ে ওঠেন ইউসুফ আলী ও আমীর গাজী। ইউসুফ আলী খান অমৃত পরিবারের সাথে এমনভাবে মিশে যান যে পরবর্তীতে অমৃত গ্র“পের প্রতিষ্ঠান তার নির্দেশনায় চলতো।

যখন আ’লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন তখনই কৌশেলে বরিশাল ত্যাগ করে ঢাকায় চলে যান এই নরপিশাচ ইউসুফ আলী খান। এদিকে নলছিটি শান্তি কমিটির সভাপতি আমীর আলী গাজী মৃত্যুবরণ করলেও তার মেয়ে নাজনিন মমতাজকে অমৃত লাল দে কলেজের প্রধান করনিক পদে চাকরী দেন বিজয় কৃষ্ণ দে বলে জানা গেছে। ২০১৫ সালে রাজাকার আমীর আলী গাজীর ঐ মেয়ে অমৃত লাল দে থেকে পেশা জীবনের অবসর গ্রহণ করেন।