সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনসহ বিভিন্ন দফতরে দৌড়ঝাপ হাফিজ বাহিনীর

0
32

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঝালকাঝিালকাঠিতে ঠিকাদারকে আটকে রেখে চাঁদাদাবী সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর আরো হিং¯্র রূপ ধারণ করেছে সন্ত্রাসী প্রিন্স ও হাফিজ বাহিনী। প্রকাশ্যে না এলেও তারা বিভিন্ন লোকজনের মাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশ করায় পত্রিকা ও ওই ঠিকাদারকে দেখে নেওয়ার হুংকার দিচ্ছে বলে জানা যায়। এদিকে নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে প্রশাসনের দরজায় ধর্না দিয়ে সরকার দলীয় নেতাদের কাছে দৌড়ঝাপ শুরু করেছে বলেও শোনা
যায়।

তবে ঠিকাদারকে আটকে রেখে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার পর সন্ত্রাসী প্রিন্স ও হাফিজ বাহিনীর নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। প্রিন্স ও হাফিজের নিজ গ্রামের একাধিক বাসিন্দা তাদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে পত্রিকা অফিসে ফোন দিয়ে নানান তথ্য দিয়ে তা প্রচারের অনুরোধ করেন। কাঠালিয়ার একাধিক বাসিন্দা মুঠোফোনে সাংবাদিকদের জানান, শিল্প মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে বীরদর্পে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালানো হাফিজ ও প্রিন্স স্কুল জীবন থেকেই এলাকায় ছিচঁকে চুরি থেকে শুরু করে স্কুলের মেয়েদের নিয়ে নানান কা- ঘটিয়েছেন।

তারা জানান, বিগত বিএনপি সরকারের সময় হাফিজের বাবা বিএনপি নেতা হওয়ায় ওই সময় নির্যাতনের শিকার অনেক ছাত্রীর অভিভাবকই এতে প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। হাফিজ তার এলাকার কতিপয় বখাটে যুবককে নিয়ে এলাকায় ছিচঁকে চুরি থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা শুরু করে। এতে তার পরিবারের লোকজনও অনেকটা ক্ষীপ্ত হয়। যার প্রেক্ষিতে এলাকায় ঠাঁই হয়নি হাফিজের। তার মা তাকে রাতের আধারে নানা বাড়ি ঝালকাঠিতে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু “কয়লা ধূলে ময়লা যায়না” এ প্রবাদকে সত্য প্রমানিত করতে দেরী করেনি হাফিজ।

নানা বাড়ি এসে মায়ের সম্পত্তি দখল করে সেখানেই বসবাস শুরু করেন তিনি। এরপর হাফিজ স্থানীয় যুবক প্রিন্স ও ময়েজসহ একাধিক সন্ত্রাসীর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে। সুচতুর হাফিজ আস্থে আস্থে প্রিন্স ও ময়েজসহ স্থানীয় নামধারী ছাত্রলীগের একাধিক কর্মীকে নিজ দলে ভিরিয়ে গড়ে তোলে সন্ত্রাসী বাহিনী। অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশ পিটিয়ে অস্ত্র ছিনতাইও করেছিল হাফিজ বাহিনী। যদিও আজ পর্যন্ত ছিনতাইকৃত অস্ত্র খুঁজে পায়নি পুলিশ।

বিএনপি সরকারের পতনের পর কৌশুলী হাফিজ আওয়ামীলীগে নাম লেখান। স্থানীয় নেতাদের ম্যানেজ করে পৌর নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে বিজয়ী হন। অবশ্য অভিযোগ রয়েছে অন্যান্য প্রার্থীদের অস্ত্র ও ক্ষমতা দাপট দেখিয়ে নির্বাচনী মাঠ ছেড়ে ফাঁকা মাঠে ভোট ডাকাতি করে নির্বাচনী বিজয়ী হয়েছিলেন। কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে হাফিজ-প্রিন্স বাহিনী। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঠিকাদারী কাজ বাগিয়ে নিতে অন্যান্য ঠিকাদারদের উপর চালান জোর-জুলুম।

তাতেও কাজ না হলে পার্সেনটিজ দাবী করে কাজ বন্ধ করে দেন। এমনকি তাদের কথা মানলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের পৃথিবী থেকে বিদায়ের হুমকি দিয়ে ফায়দা হাসিল করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, বছর দুয়েক আগে ঝালকাঠিতে রাতের আধারে এক ঠিকাদারকে কুপিয়েছিল হাফিজ বাহিনী। এরপর আর ওই ঠিকাদারকে এলাকায় দেখা যায়নি। বরিশালের রুপাতলী এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, তিনি ঝালকাঠিতে জমি কিনেছিলেন। কিন্তু হাফিজ-প্রিন্স বাহিনী তার সেই জমি দখল করে নিয়েছেন। ওই ব্যবসায়ী আরো বলেন, বর্তমানে হাফিজ ও প্রিন্স বাহিনী ঝালকাঠি সার্কিট হাউজের পেছনের একটি জমি দখলে নেয়ার পায়তারা চালাচ্ছেন।

পূর্ব চাঁদকাঠি গ্রামের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, হাফিজ ও প্রিন্স বাহিনীর চাঁদাবাজির হাত থেকে বাদ যায়না পানের দোকানদার থেকে শুরু করে চা দোকানীরাও। তিনি বলেন, এখানকার প্রায় ২০টি দোকান থেকে প্রতিমাসে মাসোয়ারা তোলে হাফিজ বাহিনী। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে তারা চাঁদাবাজি করে বলে ব্যবসায়ীরাও এতে প্রতিবাদ করতে সাহস পায়না।

হাফিজের সর্বশেষ সংযোজন ঝালকাঠিতে এলজিইডি’র আওতায় সড়ক উন্নয়ন ও কালভার্ট নির্মাণ কাজের ঠিকাদারকে ফিল্মি স্টাইলে অস্ত্র ঠেকিয়ে জিম্মী করে সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ঠিকাদারী কাজে বাধা দেয়া। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও বরিশালের স্থানীয় একটি পত্রিকার সাংবাদিক আরিফুর রহমানকে হত্যার হুমকি দিয়ে ঝালকাঠীতে প্রবেশে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে ওই সন্ত্রাসীরা। সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনসহ আইজিপি ও র‌্যাব প্রধান বরাবর আবেদন জানিয়েছেন ঠিকাদার আরিফুর রহমান।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মেসার্স এ.কে. বিল্ডার্স’র স্বত্ত্বাধিকারী আরিফুর রহমান দীর্ঘ বছর যাবৎ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সরকারের উন্নয়ন সহযোগি হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করে আসছেন। তারই ধারাবাহিকতায় এল.জি.ই.ডি-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ঝালকাঠী অফিসে আওতায় ই.জি.পি টেন্ডারে (কাঠালিয়ার আমরাতলা বাজার সড়ক ও সোনারবাংলা বাসস্ট্যান্ড থেকে ফরাজী বাড়ি সড়ক) দুটি সড়কে ৬২ লাখ টাকার দুটি কাজ লটারীর মাধ্যমে পান। এর প্রেক্ষিতে বিধি অনুযায়ী চুক্তি করার জন্য নোটিশের প্রেক্ষিতে ঠিকাদার আরিফুর রহমান গত ২৫ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠি এলজিইডি অফিসে যান।

কিছুক্ষণ পরই ঝালকাঠি শহরের মধ্যচাদকাঠি এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী হাফিজ আল মাহমুদ ও কৃষ্ণকাঠি এলাকার খন্দকার ইয়াদ মোরসেদ প্রিন্স ১০/১২ জন সহযোগী নিয়ে সেখানে হাজির হয়। তারা বিভিন্ন ধরণের হুমকি ধামকি দিয়ে ওই খানের একটি হোটেলে নিয়ে ঠিকাদার আরিফকে নানাবিধ ভয়ভীতি দেখায় এবং তাকে টেন্ডার মূল্যের ১৪% টাকা দিয়ে কাজ করতে বলে। অন্যথায় এ কাজ করতে দিবে না বলে জানায়। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতন্ডার এক পর্যায় সন্ত্রাসীরা ঠিকাদার আরিফের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় এবং একটি সাদা স্ট্যাম্পে অস্ত্রের মুখে স্বাক্ষর রেখে দেয়। স্ট্যাম্পটি সন্ত্রাসী মায়েজ এর কাছে রেখে দিয়ে ঠিকাদার আরিফকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে। সেখান থেকে বেরিয়ে ঝালকাঠির একাধিক সাংবাদিককে অবহিত করেন ঠিকাদার আরিফ। এদিকে ওই দিনই বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধানের জন্য মায়েজ এর সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোন সুফল পাননি তিনি। উপায়ন্তু না পেয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর পুনরায় ঝালকাঠি অফিসে যান।

এ সংবাদ ওই সন্ত্রাসীদেও কাছে গেলে সন্ত্রাসী আল মাহমুদ ও প্রিন্স ৫/৬ জন সন্ত্রাসী নিয়ে সেখানে গিয়ে ঠিকাদার আরিফকে টেনে হেঁচরে ঝালকাঠি টাউন হলের পার্শ্ববতী সবুজ বাংলা পাঠাগাওে নিয়ে আটকে রাখে। পরবর্তীতে সন্ত্রাসী হাফিজ আল মাহমুদ পিস্থল দেখিয়ে অশ্লীল গালাগাল ও হুমকি ধামকি দেয় এবং কাজের বরাদ্দের ১৪% দাবী করে। দাবীকৃত অর্থ না দিলে টেন্ডার কাজ করাতো দূরের কথা ঝালকাঠিতে পা ফেললেও জীবনে শেষ করার হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। কিছুক্ষণ পর তারা অস্ত্রেও মুখে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি চুক্তিনামা লিখে তাতে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেয়।

এমনকি চতুর ওই সন্ত্রাসীরা চুক্তি স্বাক্ষরের ভিডিও করে রাখে এবং ঝালকাঠি এক্সিম ব্যাংকে ঠিকাদার আরিফের এ.কে. বিল্ডার্স নামক ফার্মের নামে একটি চলতি হিসাব খুলতে বাধ্য করে। এরপর তারা ৫০ হাজার টাকার একটি চেক দিয়ে ঝালকাঠী ছাড়তে বলে। বর্তমানে সন্ত্রাসী হাফিজ, প্রিন্স ও মায়েজ গংদের ভয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে ঠিকাদার আরিফ আর আটকে গেছে সড়ক উন্নয়ন কাজ। অপরদিকে সন্ত্রাসী প্রিন্স এর মুঠোফোনে ঠিকাদার আরিফ যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, হাফিজ স্কুল জীবন থেকেই মারামারিতে অভ্যস্থ।

এছাড়া ঝালকাঠিতে আমির হোসেন আমুর পরেই হাফিজের স্থান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝালকাঠীতে আওয়ামীলীগের লোক কম। এক সময় হাফিজ আ’লীগের লোকজনকেই পিটিয়েছে এবং পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। হাফিজের উপরে কথা বলার কোন লোক ঝালকাঠিতে নেই।

তিনি আরো বলেন, আমরা সাংবাদিকদের শ্রদ্ধা করি তবে তাদেরকে কিভাবে আটকাতে হয় তাও আমাদের জানা আছে। এ প্রসংগে তিনি দু’একটি উদাহরনও দেন। তিনি বলেন, যারা নায়ক-নায়িকার মতো রাজনীতি করে তাদের নানা ভয় থাকে আমাদের সেটা নেই। ঠিকাদার আরিফকে ওই কাজ ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এটা আপনার জন্য মঙ্গল।

 

এ বিষয়ে অভিযুক্ত হাফিজের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে ঝালকাঠী জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক খান সাইফুল্লাহ পনির এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শিল্পমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে এ ধরণের ন্যাক্কারজনক কাজ করা উচিত হয়নি। এতে দলের সুনাম ক্ষুন্ন হয়। তাছাড়া উন্নয়ন কাজে বাধা দিলে বর্তমান জনপ্রিয় সরকারের উন্নয়ন কাজে ভাটা পড়বে বলেন তিনি।