সঙ্গীত লাকি দেওয়ানকে দেখালো সচ্ছলতার মুখ

0
59

এম জাকির হোসাইন, কুয়াকাটা।।

গহীন রাত। মঞ্চে যন্ত্র শিল্পীরা প্রস্তুত। উপস্থিত দর্শক অপেক্ষমাণ। সবার চোখে একটা উৎসুক ভাব। কখন আসবেন শিল্পী! পিতাহারা লাকি দেওয়ান এবার মঞ্চে এলেন। একটু পরেই বিরহ রাগে বেজে ওঠলো বাঁশি। হারমোনিয়ামের পর্দাগুলো যেন বিয়োগ ব্যথায় নতুন মাত্রা যোগ করলো। পাশেই মন্দিরা ও কাঠি ঢোল জানান দিলো ওদের উপস্থিতি।

‘সে কি আমায় চিনতে পারবেগো, জল দেখে দুই নয়নে, যারে হারিয়েছি জীবনে’ কথাগুলো সাউন্ডে ভেসে আসলো লাকি দেওয়ান’র কন্ঠে। কথা-সুর-তালের ঐকতান শ্রোতা হৃদয় নাড়িয়ে দিলো। কেউ বাবা হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন মা, আবার কেউ হারিয়েছেন দীক্ষাগুরু। বিরহ ভাবাবেগে ছল ছল করে ওঠলো অসংখ্য চোখ। কেউ কেউ জুড়ে দিয়েছেন দুর্নিবার কান্না। এভাবেই আনন্দ-বিরহ সঙ্গীত গেয়েই অর্থ উপার্জন করেন তিনি।

লাকি দেওয়ান’র (২৮) জন্ম কুয়াকাটার অদূরে ধুলাসার ইউনিয়নের অনন্তপাড়া গ্রামে। বাবা মরহুম আব্দুল সোবাহান খলিফা ছিলেন স্লুইস খালাসি। ছোটবেলা থেকে বাবার আদর্শে বড় হয়েছেন তিনি। চার বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে সঙ্গীতে তিনি-ই সাফল্য অর্জন করেন। স্বামী ফোরকান হাওলাদার তাকে সঙ্গীতের প্রতি উৎসাহ দিয়ে আসছেন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়–য়া সানজিদা আক্তার নীলা তার একমাত্র সন্তান। ৭/৮ বছর বয়সে তিনি কোডেক শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে ভর্তি হন। সেখানেই সঙ্গীতের চর্চা শুরু হয় তার। আন্তঃবিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় উপজেলার মধ্যে সঙ্গীতে তিনি প্রথম হন। নিজ গ্রাম ছেড়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লো তার সুনাম।

লাকি দেওয়ান ছিলেন ধুলাসার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। পারিবারিক কারণে লেখাপড়া আর হয়নি তার। পরে ১৪ বছর বয়সে ওস্তাদ বাবুল দেওয়ানের হাতে শুরু হয় গুরুমুখি সঙ্গীত শিক্ষা। তিনি বাউল সঙ্গীতের মৌলিক শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ওস্তাদের সাথে শুরু করেন বিভিন্ন পালা গানে অংশগ্রহণ। এতে তার মঞ্চে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে। তখন থেকে তাকে আর পিছনে ফিরতে হয়নি। যার ফসল ‘এই দুঃখিনীর মনের ব্যথা’ নামে একটি গানের সিডি।

লাকি দেওয়ান’র উপার্জনের একমাত্র উপায় সঙ্গীত। দেশের বিভিন্ন জেলায় গানের বায়না ধরেন তিনি। প্রত্যেক বায়নায় তার আয় হয় ৫ হাজার থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। যন্ত্র শিল্পী নিয়ে তিনি গান করেন সারা রাত। পালা গানে কখনও শ্রোতাদের হাসিয়ে আনন্দ দেন। আবার কখনও বিরহ গানে বুক হালকা করেন শ্রোতাদের। গান শুনে শ্রোতারা সম্মান ও আশীর্বাদ করেন বকশিস দিয়ে। এভাবেই তার জীবিকার ব্যবস্থা হয়। যন্ত্র শিল্পীদের মাঝে টাকা ভাগ করে দিয়ে যা থাকে তা দিয়ে চলে তার সংসার।

সঙ্গীত জীবনে তার বড় অর্জন কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সঙ্গীত জীবনে অনেক সম্মান ও অর্থ পেয়েছি। বরিশালের রসুলপুরে এক অনুষ্ঠানে আমায় গলায় অসংখ্য ফুলের মালা পরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। যেগুলোর ভারে আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। কিন্তু তার চেয়েও বড় অর্জন হচ্ছে আমার দাদা পীর হযরত ইসমাইল শাহ (র)’র আশীর্বাদ। তিনি আরও বলেন, মানুষ হবার পথ দেখিয়ে যিনি সন্তান হিসেবে আমাকে গ্রহণ করেন তিনি আমার দীক্ষাগুরু আলহাজ¦ বারেক চিশতী।

শিল্পী লাকি দেওয়ান সম্পর্কে চাপলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ধুলাসার ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি জলিল আকন বলেন, লাকি আমার ছাত্রী। ছোটবেলা থেকেই ওর গানের প্রতি প্রবল ঝোঁক। একজন মেয়ে হয়ে সঙ্গীতের মাধ্যমে সে স্বাবলম্বী হয়েছে। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এখন অন্যান্য জেলায়ও তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। সঙ্গীতে তার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

দীক্ষাগুরু কলাপাড়া উপজেলা আধ্যাত্মিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব বারেক চিশতী বলেন, লাকি আমার রুহানি সন্তান। ওর গান মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধির কথা বলে। ওর গান প্রকৃত মানুষ হবার পথ দেখায়। আমার আশীর্বাদ ওর মাধ্যমে যেন সত্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়।

লাকি দেওয়ান সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। বছরের ৬/৭ মাস কবি গানে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। বাকি মাসগুলোতে তেমন একটা বায়না হয় না। তবু চলে যায় তার সংসার। উপার্জনের জন্য তাকে গুনতে হয় আরেকটি নতুন বছর। এভাবেই তিনি বুক বাঁধেন নতুন এক সঙ্গীত রাতের আশায়…..###