সরোয়ারের পতন শুরু!

0
30

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরিশাল সিটি নির্বাচনে তরুণ সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ’র কাছে হেরে গেলেন প্রবীন রাজনীতিবিদ মজিবর রহমান সরোয়ার। সরোয়ার কখনো হারেন না বলে নগরীতে এক কিংবদন্তি থাকলেও তাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন সাদিক আবদুল্লাহ।

দুর্গে হানা দিয়ে বরিশালের বাঘখ্যাত সরোয়ারকে পর্যুদস্ত করেছেন সাদিক নামের এ সিংহ শাবক। সিটি নির্বাচনে ছেলের বয়সী সাদিকের কাছে শুধু সরোয়ার পরাজিতই হননি বরং বরিশালে তার ইমেজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। অন্যদিকে আস্থার সংকটে বিএনপির নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকরা।

সদ্যসমাপ্ত বরিশাল সিটি নির্বাচনের মান নিয়ে ব্যাপক বির্তক বা অভিযোগ যেমনি আছে, তেমনি সরোয়ারের এ পরাজয়ের নেপথ্যে তার নিজের রহস্যজনক ভূমিকা একেবারে কম গুরুত্বপূর্ন নয়। এমনটাই দাবি করেছেন স্থানীয় বিশ্লেষকমহল। সবচেয়ে বড় যে অভিযোগটি উঠেছে সেটি হল, সরোয়ার এ নির্বাচনের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না ।

আর সংসদ নির্বাচনকে পাশ কাটিয়ে এ নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোন ইচ্ছেও ছিলনা তাঁর। একথা সরোয়ারই বারংবার গণমাধ্যমকে বলে বেড়িয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, সিটি নির্বাচন করার তার কোন ইচ্ছে ছিলনা। জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার ইচ্ছে তার। তবুও দল তাকে বাধ্য করায় তিনি অংশ নিয়েছেন।

একমত হতে নারাজ তৃণামুলের নেতা-কর্মীরা। কারন হিসাবে বলছেন সরোয়ার একজন কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে নগর নির্বাচনে না আসে অন্য কোন বিএনপির নেতাকে দিয়েই সিটি নির্বাচন করাতে পারতো। তবে সরোয়ার যে এ সিটি নির্বাচনে একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না তা প্রকাশ পায় গতকাল তার ভোট প্রদানের সময়। সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে ভোট দিতে সকাল সাড়ে আটটার দিকে নিজ কেন্দ্র সৈয়দা মজিদুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ভোট দিতে যান। কিন্তু তিনি ভোটার স্লিপ বা সিরিয়াল নম্বর কিংবা কোন বুথে তিনি ভোট দিবেন কিছুই তিনি জানতেন না। অবশেষে কয়েকজন নেতা-কর্মী নিয়ে কেন্দ্রের দোতলায় উঠেন এবং দুই তিনজনসহ ভেতরে প্রবেশ করেন।

এসময় সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে তাকে ভোটার নম্বর জিজ্ঞেস করলে তিনি তা বলতে পারেন নি। এ সময় ওই প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বলেন, ‘ভোটার নম্বর ছাড়া ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। আর এখন নম্বর খুঁজে বের করা যাবে না।’ এসময় সরোয়ায় খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পরেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সরোয়ারকে তখন এক অসহায় শিশুর মতো লাগছিল। কিভাবে এই বৈতরণী পার হয়ে নিজের ভোট দিবেন বা সম্মুখে অবস্থান নেয়া ঢাকা থেকে আগত ও স্থানীয় সাংবাদিকদের কিই বা বলবেন খেই হারিয়ে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি। পরক্ষণে সরওয়ারের সঙ্গে থাকা লোকেরা অদূরে তার বাসায় গিয়ে তার ভোটার নম্বর নিয়ে আসেন।

যেই দুজন লোক সরোয়ারের ভোটার স্লিপ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন এই আ’লীগের সমর্থকরা সরোয়ার এজেন্ট বের করে ভোট কারচুপি করছেন বলে তুমুল হট্টগোল শুরু করে। কোনমতে ভোট দিয়ে কেন্দ্রের বাইরে এসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে চাইলেও গগনবিদারী নৌকা স্লোগানে একমুহূর্তও টিকতে পারেননি তিনি। যদিও তিনি এসময় সাংবাদিকদের ভোট বর্জনের ইঙ্গিত বলা চলে একরকমের ঘাড় ধরেই সরোয়ারকে বের করে দেয়া হয়। শ্বেত বর্ণের সরোয়ার এসময় রেগে লালবর্ণ ধারণ করেন। কিন্তু এসময় তার পক্ষেও কোন লোকজনকে কোন ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি।

নীরবেই সটকে পরতে হয় তাকে পরবর্তীতে এ কেন্দ্রটি আ’লীগের দখলে চলে যায়। এই যদি হয় তার নিজের ভোটকেন্দ্রের অবস্থা তা হলে পুরো নগরীতে কি অবস্থান বিএনপির ছিল তা সহজেই অনুনমেয়। এদিকে ভোটার স্লিপ না নিয়ে যেমনি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় বনে গেছেন, তেমনি হোমওয়ার্ক না করে ভোটে নেমে তাকে পরাজিত হতে হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকমহল।

এদিকে মেয়র প্রার্থী সরোয়ার ভোটার নাম্বার না নিয়ে ভোট দিতে যাওয়ায় বিএনপিকে অযোগ্যদের দল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র আইসিটি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয়। এতো গেল সরোয়ারের নিজের ভোটার স্লিপের কথা। এমনিভাবে সাধারণ ভোটারদেরও স্লিপ পৌঁছাতে পারেনি বিএনপি।

অজ্ঞাত কারনে ভোটের আগের রাতে কেন্দ্র খরচ বা এজেন্টদের পারিশ্রমিকও দেননি তিনি। এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র না ছাড়তে ছিলোনা কোন কঠোর নির্দেশনা। এমনটাই বিস্ময়কর তথ্য জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতাকর্র্মী। কর্মীরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত মাঠে টিকে থাকারও কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি সরোয়ারের পক্ষ থেকে। আর মাঠে টিকে থাকার মতও নেতা-কর্মী কেউ কেন্দ্রে ছিলনা। ঠিক যেন আ’লীগে ব্যালট বাক্স ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

 

ভোটের দিন অনিয়ম নিয়ে ভোট কেন্দ্রের ভেতরে বাসদের মনীষা চক্রবর্তীকে যতটা প্রশংসনীয় ভূমিকা নিয়েছেন তেমন করে নেতাকর্মী নিয়ে প্রতিরোধ গড়াতো দূরের কথা স্বংয় সরোয়ারকে কোন সরাসরি ভূমিকায় দেখা যায়নি। এমনকি ভোটের আগের দিন তিনি ভোট বর্জন করবেন বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। আগেরদিন না করলেও ভোট প্রদান করেই ভোট শুরুও ঘন্টা খানেকের মাথায় তার ভোট বর্জনের ইঙ্গিত প্রমান করে তিনি আসলে জিতে সিটি মেয়র হতে নন, ভোট বর্জন করতেই নির্বাচনে নেমেছেন।

 

তার একমাত্রই কারণ হতে পারে সংসদ সদস্য হওয়ায় পথ সুগম করা। ওনার এই অনিচ্ছার নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায়ও তেমন কোন জোড় ছিলনা। আ’লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ যখন গণসংযোগে নগরের বর্ধিত অর্থাৎ গ্রামীণ এলাকা চষে বেড়িয়েছেন তখন সরোয়ার শুধু সদররোড কেন্দ্রিক এলাকায় ফটোসেশনের গণসংযোগ করেছেন।

 

এতে তিনি খুব কম মানুষকেই টানতে পেরেছেন। আর ভোটারদেরতো আস্থা অর্জনেও তিনি ততটা সক্ষম হতে পারেন নি বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে। তাদের মতে, সরোয়ার যখন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন তখন তিনি কোন দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে পারেন নি। একদিকে পরীক্ষিত ব্যর্থ মেয়র হিসেবে জনগণের যেমনি কথা রাখেন নি তেমনি দুর্র্নীতি-লুটপাট করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। মেয়র থাকাকালীন তিনি ঠিকাদারদের কাছে পরিচিত হয়েছিলেন মিস্টার টেন পার্সেন্ট হিসেবে। যার দরুন এক-এগারোর আমলে তাকে জেলে যেতে হয়েছিল।

 

আগে থেকেই গুঞ্জন ছিল, নিজে এমপির পদ ধরে রাখতে সরোয়ার মেয়র পদের বিনিময়ে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ’র সাথে সমঝোতা করেছেন। গতকালকের সরোয়ারের নীরব দর্শকের ভূমিকা একটু হলেও এ গুঞ্জনকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। সরোয়ারের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত একসূত্র দৈনিক সময়ের বার্তাকে নিশ্চিত করছে, এ সমঝোতার কারনে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে কোন আন্দোলন সংগ্রামেও সরোয়ারকে দেখা যাবে না। তাঁর চিন্তা এখন শুধু এমপি নির্বাচন।

 

যদিও বিএনপির একাধিক নেতা বলছেন, দলে তিনি একাই নেতা নন । আরো অনেক নেতা রয়েছেন। এবারের সিটি নির্বাচনেও অনেক মেয়র হিসেবে নির্বাচনে আগ্রহী ছিল। কিন্তু দলীয় নমিনেশন না পাওয়ায় সরোয়ায়র নির্বাচন করেছেন। তিনিই আবার এমপি নির্বাচন করবেন তা মেনে নেয়া হবেনা বলে উল্লেখ করেন মহানগর বিএনপির এক র্শীষ নেতা। গত জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে সংসদ থেকে বিতাড়িত হয়েছেনই, এবারের সিটি নির্বাচনে হেরে গিয়ে সরোয়ার সম্্রাজের পতন শুরু হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষকমহলের আশংকা!