স্বাধীনতা-সাহস ও সাংবাদিক সুরক্ষা আইন মোমিন মেহেদী

0
202

স্বাধীনতার মাস মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসের ২ তারিখে বাংলাদেশের পতাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় উত্তোলন করা হয়। সত্যিকারের ইতিহাস সবসময় আলোর পক্ষে-ভালোর রক্ষের জন্য নিবেদিত। তাই নির্ভয়ে বলে যাই- গেন পতাকা উত্তোলন করেন নিবেদিত দেশপ্রেমিক আসম রব। যদিও তিনি নিজের বিভিন্ন ভুলের কারনে নির্মমতার রাজনীতির গ্যাড়াকলে পড়ে রাজপথ থেকে বিতারিত হয়েছেন। তবু বলবো- বাংলাদেশে স্বাধীনতার জন্য পতাকার জন্য নিবেদিত ছিলেন তিনি।

এরপর ৭ মার্চ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। অন্যদিকে কালো অধ্যায় হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর গণহত্যা চালায়। ২৬ মার্চ বাংলার মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মার্চ বাঙালির কাছে একটি অন্যরকম আবেগ আর আলোআশার মাস। এই মাসে আমরা রক্ত দিয়েছি। আবার এই মাসেই রক্ত নেয়ার দীপ্ত শপথে জ্বলে উঠেছি। মার্চ মাসে আমরা স্বাধীনতা চেয়েছি, তা পেয়েছিও।

হয়তো এ জন্য আমাদের তিরিশ লাখ স্বজনের জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে। সম্ভ্রম হারিয়েছে আড়াই লাখ মা-বোন। ‘স্বাধীনতা’ এমন এক পবিত্র ও অমূল্য সম্পদ- যাকে পেতে মানুষ যে কোনো ত্যাগ স্বীকারেই প্রস্তুত। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমরা পরাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা চেয়েছি। ২০১৯ সালের এই মাসে আমরা আরো কিছু স্বাধীনতা চাই। আমরা অফিস-আদালতে ঘুষ না দিয়ে কাজ করার স্বাধীনতা চাই। হাসপাতালে ডাক্তারকে অতিরিক্ত ফি না দিয়ে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার স্বাধীনতা চাই। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবশ্রেণিতে বিনামূল্যে অধ্যয়নের স্বাধীনতা চাই। যে কোনো মুহূর্তে পুলিশ নামের আতঙ্ক থেকে স্বাধীনতা চাই। শুধু এখানেই শেষ নয়; যে পুলিশ সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও কলার ধরে, মিথ্যে মামলায় অবিরত হয়রানি করে; তাদের হাত থেকে রেহাই চাই-স্বাধীনতা চাই।

একই সাথে আমাদের দেশ বাঁচাতে বনদস্যুদের হাত থেকে বন, ভূমিদস্যুদের হাত থেকে ভূমি এবং জলদস্যুদের হাত থেকে জলসীমা রক্ষার স্বাধীনতা চাই। এমন কি আমরা গুম-খুন-ক্রসফায়ারের হাত থেকেও বাঁচার স্বাধীনতা চাই। চিরদিন জেনে এসেছি বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। আজ যে দিকে তাকাই সে দিকেই দেখি ধর্মীয় মৌলবাদীরা রক্তপিপাসু দীর্ঘ জিহ্বা বের করে মানুষের রক্তপান করতে চাপাতি হাতে দিগ্বিদিক ছুটছে। সেই উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাত থেকে দেশ-মানুষ ও ধর্ম রক্ষার স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা চাই- সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দালালির হাত থেকে। যারা নির্বিচারে ব্যাংক লুট করছে, শেয়ার মার্কেটের টাকা বিদেশে পাচার করছে- তাদের হাত থেকে ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেট রক্ষার স্বাধীনতা চাই। আকাশ-সড়ক- রেল ও নৌপথে নিরাপত্তা চাই, চাই নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা।

পুরো দেশ ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে; রাস্তায় আবর্জনা-ধুলো, ফুটপাতে আবর্জনা, শিক্ষাঙ্গনের সামনেও পড়ে থাকে পরিবেশ বিনষ্টকারী আবর্জনা। আমরা আবর্জনার দুর্গন্ধ নয়, ফুলের সৌরভ উপভোগের স্বাধীনতা চাই। প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তি মানুষের স্বপ্ন বেহাত হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারে কেনাবেচা হচ্ছে আলোকিত মানুষের মগজ। আমরা স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতা চাই। মেধাপাচার নয়, মেধা সংরক্ষণের স্বাধীনতা চাই। আইন অমান্য সংস্কৃতি থেকে আইন মেনে চলার পরিবেশ ফিরে পেতে চাই। এমন একটা স্বাধীন দেশ চাই, যেখানে কথায় কথায় কোন অন্যায় আর দুর্নীতির রাজত্ব নির্মাণের চেষ্টা থাকবে না। যেভাবে বাংলাদেশকে গত ৪৭ বছরে কেবলই ব্যবসা-স্বার্থ হাসিলের রাস্তা তৈরি করেছে ছাত্র-যুব-শ্রমিক রাজনীতির রাঘব বোয়ালরা; সেভাবে বাংলাদেশকে দেখতে চাই না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র নেতা ও গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে যখন দেখি যে, ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপির বিবৃতি প্রদানকালে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়; তখন নির্ভীক চিত্তে বলতেই হয় যে, এমন দেশ-এমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এমন ছাত্র রাজনীতি আমরা চাইনি। আমরা চাই স্বাধীন- সোনার বাংলাদেশ-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। যে কারনে স্পস্ট করে বলতে চাই- গত ১০ বছরে নির্যাতিত সাংবাদিকের সংখ্যা দু’হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং টক-শোতে সরকারের সমালোচনার স্বাধীনতার অবস্থা সামরিক শাসনের চেয়েও খারাপ। এসবের প্রতিবাদ হচ্ছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্যাতনের মাত্রা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পুলিশ সরাসরি সাংবাদিকদের দিকে বন্দুক তাক করে গুলি করেছে এমন ঘটনা ঘটেনি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচিত কর্মকর্তা সাংবাদিক আমিনুল হক ভূঁইয়া এবং আওয়ামী লীগের এক এমপি’র মালিকানাধীন এক দৈনিকের ফটো সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হন। কিন্তু প্রতিবাদ হয় খন্ডিত। শুধু প্রচার হয় পুলিশের ওপর তান্ডবের খবর। এই পরিস্থিতির উত্তরণে নিরন্তর এগিয়ে চলা চাই আমাদের-যাদের হৃদয়ে আছে সাহসের রাজত্ব। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। যেসব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার আশ্বাস দিয়েও সাগর-রুনি হত্যারহস্য উন্মোচনে পর্বতপ্রমাণ ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন, রুনির চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ করছেন, তাদের খবর প্রচার না করার দাবি তো শুনিনি। রাজনৈতিক দল বা অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছে আমাদের প্রথম অনুরোধ, কোনো ক্ষেত্রেই সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা করবেন না। কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ভাঙচুর বা পোড়াবেন না। কোনো গণমাধ্যমের সাংবাদিকের জন্য খবর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করবেন না।
অবশ্য এখন অনেকেই বলেন, আমাদের দেশে সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। অনেক আগে থেকেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে চললেও বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা দেশের গণমাধ্যমজগতের জন্য এক অশনিসংকেতই বটে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো সংবিধানস্বীকৃত স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার খর্ব করে, যা কোনো সুশাসিত ও গণতান্ত্রিক দেশে কাম্য নয়। আমরা একটু অতিতে ফিরে গেলে দেখবো যে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন আর্টিকল ১৯-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ছিল ১২.৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে এই হার হয় ৩৩.৬৯ শতাংশ। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সাংবাদিকদের হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে ১০৬ শতাংশ। হয়রানির মধ্যে মানহানির দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে মোট ২১৩ জন সাংবাদিক ও আটজন ব্লগার বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

এর মধ্যে চারজন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, গুরুতর জখম হয়েছেন ৪০ জন। আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬২ জন সাংবাদিক। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত পেশাগত কারণে ২৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। কিন্তু এসব হত্যাকান্ডের মধ্যে শুধু সমকাল পত্রিকার ফরিদপুর ব্যুরোপ্রধান গৌতম দাস হত্যাকান্ডে জড়িত থাকায় ঘটনার প্রায় সাড়ে সাত বছর পর ২০১৩ সালের ২৬ জুন ৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের হাতে চারজন খুন ও দুজন অপহরণসহ ৩০১ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ওই সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশে ২০১৪ সালে দুজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন, ২৩৯ জন সংবাদকর্মী বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা ম্যাসলাইন মিডিয়া সেন্টারের (এমএমসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১২ সালে ২১২টি ঘটনায় ৫১২ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতিসহ খুন হয়েছেন পাঁচ সাংবাদিক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের ২০১৩ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিচারে বিশ্বের ১৯৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫। এর আগে ওই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ২০১২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১২। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স প্রকাশিত ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৪ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬। সূচকে বাংলাদেশের অবনতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়, এর আগে ২০১৩ সালে ১৭৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৪। সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হামলাকারীরা ‘অদৃশ্য শক্তির’ প্রভাবে ছাড় পেয়ে যাওয়ার ঘটনাও সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানিকে ত্বরান্বিত করছে। আর এ কারণেই হয়তো সাংবাদিক সাগর-রুনি, শামসুর রহমান, মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির বালুসহ অনেক সাংবাদিক পরিবার দীর্ঘদিনেও তাদের স্বজন হারানোর বিচার পায় না।

আর প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের এই স্লোগান লিখতে হয়, ‘বিচার পাই না তাই বিচার চাই না’। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে এর চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে? এমন প্রশ্নবোধক সময়ের হাত ধরে রাজপথে তৈরি হই ¯্রােতের বিপরিতে লড়বো বলে। আমরা এখন অনেক কথা বলতে গিয়েও বলতে পারি না, নিরবে বয়ে চলে কান্নার নদী; আসে নির্যাতনের স্টিম রোলার যদি। আমি তবু বলি-সাহসের সাথে পথচলি- দেশে অগণতান্ত্রিক চর্চা, স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, অনিয়ম, দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যম সব সময়ই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সোচ্চার ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে আসছে।

তবে হ্যাঁ, যদি কখনো কোনো সংবাদপত্রে বা কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অসত্য ও ভিত্তিহীন হয়, তাহলে যাঁর বিরুদ্ধে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তিনি বা সেই সংস্থা বা সংগঠনের সঙ্গে সংশিষ্ট ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবে ক্ষুব্ধ হতেই পারেন। সে ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধরা প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ পাঠালে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা বা গণমাধ্যম ওই প্রতিবাদ ছাপাতে বাধ্য। এ ছাড়া তাঁরা প্রতিকারের জন্য প্রেস কাউন্সিল বা আইনের আশ্রয়ও নিতে পারেন। কিন্তু তা না করে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহারের চেষ্টা দেশে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাবলিকে আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।

দেশের সরকার ও জনগণ নিশ্চয় সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। দেশ ও জনগণের সার্বিক মঙ্গলের স্বার্থেই সাংবাদিক ও সংবাদপত্র দমননীতির মনোভাব প্রকাশ থেকে সবারই দূরে থাকা উচিত। ভবিষ্যতে আর যেন কোনো সাংবাদিককে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হতে না হয়, তাঁদের ওপর আর যেন কোনো প্রকার অন্যায়, জুলুম, নির্যাতন, হয়রানি না চলে সে বিষয়গুলো সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দেশে সংঘটিত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের সঠিক তদন্তের ভিত্তিতে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা তথা তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। অন্যথায় দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন, উন্নয়ন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশসহ সব কিছুই বাধাগ্রস্ত হবে, যা কারো কাম্য নয়। কাম্য নয় এটাও যে, বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল না করে সেই টাকা আত্মসাত করার সংবাদ তথ্য-উপাত্ত সহ প্রকাশের পর সেই পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক-সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যে মামলা হবে। কাম্য নয়; বিনা ওয়ারেন্টে একজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হবে। কাম্য নয়; মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে সংবাদকর্মীদের মানববন্ধন থেকে কলার ধরে হিরহির করে টেনে নিয়ে আটক করবে পুলিশ।

এটাও কাম্য নয় যে, একজন ম্যাজিষ্ট্রেট নথি জালিয়াতি করে সাংবাদিকদেরকে হয়রানি করবে। বিশেষ করে যা হয়েছে- বরিশাল থেকে প্রকাশিত স্বাধীনতার স্বপক্ষের গণমানুষের দৈনিক আজকের সময়ের বার্তা পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক সহ ৪ সংবাদকর্মীর বেলায়; তা কোনভাবেই একটা সভ্য দেশের নাগরিক হিসেবে অন্তত আমার কাম্য নয়। পত্রিকাটি এম লোকমান হোসাঈনের সম্পাদনায় নিয়মিতভাবে দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে আসছে শুরু থেকেই। এরই ধারাবাহিকতায় বরিশাল জেলা পরিষদের বেশ কিছু দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হয়।

উক্ত সংবাদের জের ধরে পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মোঃ ফরহাদ হোসেন ফুয়াদ ও যুগ্ম সম্পাদক মোঃ সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৩০/০১/২০১৯ ইং তারিখ বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মইদুল ইসলাম বাদী হয়ে বরিশাল চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে বিজ্ঞ বিচারক মোঃ কবির উদ্দিন প্রামানিক এর আদালতে ১০ কোটি টাকার মানহানির একটি মামলা দায়ের করেন। এসময় উক্ত মামলায় ২০১৮ সনের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৬ এর ২৫/২৯ ধারায় এবং দঃ বিঃ আইনের ৫০০,৫০১, ৫০২ ও ১০৯ ধারা উল্লেখ করেন। বিজ্ঞ বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এফ.আই.আর হিসাবে নেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। যাহার নালিশী মামলা নং- এমপি ২৩/২০১৯ (কোতয়ালী),তারিখঃ- ৩০/১/২০১৯। এর কিছুদিন পর অর্থাৎ মার্চ মাসের ১৩ তারিখ উক্ত মামলাটির নথি (নালিশী, আদেশ) সরিয়ে দিয়ে একটি নতুন নথি স্থলাভিষিক্ত করেন।

যাহার নালিশীতে দঃবিঃ আইনের ৫০০/৫০১/৫০২/১০৯ ধারার পাশাপাশি আরো নতুন কিছু ধারা যেমন- ৩৮৫ /৩৮৬/ ৩৮৭ /৩৭৯ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কোন ধারা উল্লখ করা হয়নি। এই মামলার নাম্বারটা ও দেখা যায় এম.পি-২৩/২০১৯ ( কোতয়ালী)। এবং আদেশে দেখা যায় যে, এই মামলাটি দায়ের হয়েছে ৩০/১/২০১৯ তারিখে। যেখানে সংশ্লিষ্ট ধারায় অর্থাৎ, দঃবিঃআইনের ৩৮৫/৩৮৬/৩৮৭/৩৭৯/৫০০/৫০১/৫০২ ধারায় অপরাধ আমলে গ্রহন করে এফ.আই.আর এর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ৩০/১/২০১৯ তারিখের দায়েরকৃত নালিশীতে দঃবিঃআইনের ৩৮৫/৩৮৭/৩৭৯ ধারা আদৌ ছিল না। এমনকি উক্ত ৩০/১/২০১৯ তারিখের ফাইলিং রেজিস্টারেও এই ৩৮৫/৩৮৭/৩৭৯ ধারার কোন অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ, সম্পুর্ণ বে-আইনী ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই ধরনের ন্যাক্কারজনক কর্মকান্ড স্বয়ং বিজ্ঞ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জনাব কবির উদ্দিন প্রামানিক করেছেন।

এমতবস্থায় আমি নিজে যেহেতু একজন নগণ্য সংবাদ-শিক্ষা ও সমাজকর্মী, সেহেতু বলবো যে, সময়ের বার্তার সম্পাদক সহ সকল সাংবাদিক-কর্মকর্তা-কর্মচারি চরম মানবেতর জীবন যাপন থেকে মুক্তির জন্য নিরপেক্ষতার আলোকে তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রত্যাহার চাই। স্বাধীনতার মাসে সাংবাদিক নির্যাতন-নিপীড়ন-হয়রানি-হামলা-হত্যা থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম সুরক্ষা আইন চাই। যে আইন নীতিগতভাবে আদর্শ সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের রক্ষাকবচ হিসেবে বারবার রক্ষা করবে ভয়াবহ সব মিথ্যে মামলা আর নির্যাতন নিপীড়ন থেকে…

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবি ও প্রতিষ্ঠাতা, অনলাইন প্রেস ইউনিটি
ঊসধরষ: সড়সরহসধযধফর@মসধরষ.পড়স
০১৭১২৭৪০০১৫