হাতপাখার টেনশনে ধানের শীষ!

0
32

সোহানুর রহমান ॥ রাজনীতির ময়দানে আলোচনায় নেই। কিন্তু দলটি এগিয়ে জনসমর্থনে। সদ্য সমাপ্ত গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্ধিতায় না আসতে পারলেও ভোটের অংকে চমক দেখিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

ফলাফল প্রকাশের পর ভোটের অংক দেখে বিস্মিত রাজনৈতিক বিশেষকরা। ভোটের হিসেবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপির পরই ধর্মভিত্তিক এ দলটির অবস্থান। চরমোনাইয়ের পীরের দল হিসেবে পরিচিত ইসলামী আন্দোলনের পরবর্তী নিশানা হচ্ছে বরিশাল সিটি নির্বাচন।

বিসিসি নির্বাচনে লড়তে এবারই প্রথমবারের মত দলীয় প্রার্থী দিয়েছে দলটি। মনোনয়ন দাখিল করেই ৩০ জুন দলটির প্রার্থী মাওলানা ওবাইদুর রহমান দোয়া আনতে চট্টগ্রামে হাটহাজারী কওমী মাদরাসার মহাপরিচালক ও হেফাজত ইসলামের আমীর আলামা শাহ আহমাদ শফীর সাথে দেখা করতে যান।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে হেফাজতের কাঙ্খিত সমর্থন লাভ করেন তিনি। ধর্মভিত্তিক দল ইসলামী আন্দোলন ও হেফাজত ইসলামের এই যোগসূত্রকে বিএনপির জন্য ঝুঁকি হিসেবে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল। তাদের মতে, এবারের সিটি নির্বাচনের আবহটা অনেকটাই অন্যরকম।

৩১ বছর বয়সী এই দলটির যেহেতু বরিশালের অদূরেই গোড়াপত্তন। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রর্দশন করে বিসিসি নির্বাচনে ভোটের ফলাফলের মাধ্যমে জনসর্মথনের আওয়াজ দিতে চাইবে দলটি। নগরীতে ইসলামী আন্দোলনের ৩০ হাজার ভোট রয়েছে বলে দাবি করেছেন দলটির বরিশাল জেলার সাধারন সম্পাদক মাও. সিরাজুল ইসলাম। তার কথা বাদ দিয়ে হিসেব মেলালেও এখানে কম করে হলেও তাদের যে ১৫-১৭ হাজার ভোট রয়েছে সেটা নিশ্চিত।

আর এই ১৫-১৭ হাজার ভোট যদি বিএনপি হারায় তাহলেই জয়ী হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে তাদের জন্য। জামায়াতের সাথে সমঝোতা হলেও অন্য শরীক দল খেলাফত মজলিশ প্রার্থী দেয়ায় এক রকম চাপের মুখেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার।

নাজুক অবস্থানের কারনে খেলাফতকে হিসেবে না ধরলেও ইসলামী আন্দোলকে একেবারে ফেলনা ভাবছে না বিশেষকমহল। যখন ইসলামী আন্দোলনকে নিয়ে বিএনপির টেনশনের পারদ চড়ছে তখন জাতীয় পার্টি আর বাম বলয় নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ঋণ খেলাপির দায়ে বাতিল হয়েছে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসের মনোনয়ন প্রাথমিকভাবে বাতিল হয়ে গেছে। সমর্থক না দেখাতে পারায় জাপার বিদ্রোহী প্রার্থী বশিরুল আহমেদ ঝুনুর দশা তাপসেরই মত।

যদিও এতে চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন ঝুনু। আর বাম বলয়ের সিপিবির প্রার্থী একে আজাদ কখনোই তার জামানত রক্ষা করতে পারেন নি। বাসদের প্রার্থী ব্যাক্তিগতভাবে কিছু প্রগতিশীল তরুণ প্রজন্ম ও শ্রমজীবী মানুষের ভোট টানলেও আ’লীগের র্দুগে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। তাই চিন্তামুক্ত সাদিক আবদুলাহ জোরেশোরে প্রচারণা শুরু করেছেন।

বিএনপির কথা একটাই, বরিশাল বিএনপির ঘাঁটি। বারবার সরোয়ার এবং মহানগর বিএনপি বলে আসছে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। তবে তা মানতে নারাজ আ’লীগের বরিশাল মহানগর কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী।

বরিশাল যে এখনও বিএনপির ভোটের ঘাঁটি তা তিনি মনে করেন না। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন এবং বরিশালে আওয়ামীলীগ আগের তুলনায় অনেক বেশি সংঘবদ্ধ হওয়ার ফসল হিসেবে সাদিক বিজয়ী হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। এদিকে গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা জাকারিয়া হামিদী জানিয়েছেন, ‘এবারের নির্বাচন অন্যান্য সময়ের নির্বাচনের মত নয়।

আর বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন খুলনা, গাজীপুরের মতো আইওয়াশ নির্বাচন করার চিন্তা করলেও সরকার ভুল করবে। এবার বরিশালের সকল আলেম ওলামা, ধর্ম-বর্ণ, ইসলামী জনতাসহ সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ পীর সাহেব চরমোনাই’র সমর্থিত হাতপাখা মার্কার প্রার্থীর সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে । এর সাথে হেফাজতে আমীরের সমর্থনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র ভোটব্যাংক আরো শক্তিশালী হয়েছে। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমরাই বিজয়ী হবো ইনশালাহ’।

 

ভোটের হিসেব-নিকেশ আর ঘর গোছাতে ব্যাতিব্যস্ত কৌশলী নির্বাচন ‘ম্যানেজার’ সরোয়ারে ভাগ্যে কি ঘটছে জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ৩০ জুলাই বিকেল অবধি। সূত্রমতে, ১৯৮৭ সালে চরমোনাই পীর মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম রাজনৈতিক দল হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে দলটির আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তারা সাত দল মিলে ইসলামী ঐক্যজোটের অধীনে নির্বাচন করে। এ দুবারই তাদের দুজন প্রতিনিধি সাংসদ নির্বাচিত হন।

২০০০ এর নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ গাঁটছড়া বাঁধে এরশাদের জাতীয়পার্টির সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে সে মৈত্রী আর্দশিক কারনে স্থায়িত্ব লাভ না করায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে জোট থেকে বের হয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সেবার ১৬০ আসনে প্রার্থী দিয়ে তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের বাইরে একমাত্র দল হিসেবে মোট ভোটের ১ শতাংশের বেশি ভোট পায়। এমনকি ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে প্রায় ২৯ হাজার ভোট পায় এই দলের প্রার্থী। সদ্য শেষ হওয়া গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে দলটির অবস্থান তৃতীয়।

এখানে তাদের মেয়র প্রার্থী মো. নাসিরউদ্দিন হাতপাখা প্রতীকে পেয়েছেন ২৬ হাজার ৩৮১ ভোট। এবারই প্রথম তারা এই সিটিতে নির্বাচনে অংশ নেয়। এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী পান ১৬৫৯ ভোট এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও (সিপিবি) প্রার্থী পান ৯৭৩ ভোট। খুলনা সিটির নির্বাচনেও প্রথমবার অংশ নিয়ে ইসলামী আন্দোলন পায় ১৪ হাজার ৩৬৩ ভোট। এটি ছিল ওই নির্বাচনে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট।

খুলনা সিটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টিও মেয়র প্রার্থী পান ১ হাজার ৭২৩ ভোট। আর সিপিবির প্রার্থী পান ৫৩৪ ভোট। এর আগে ২০১৫ সালে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরেই তৃতীয় অবস্থানে ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ঢাকা উত্তরে তাদের প্রার্থী শেখ ফজল বারী মাসউদ পেয়েছিলেন ১৮ হাজার ভোট। আর দক্ষিণে আবদুর রহমান পান ১৫ হাজার ভোট। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও দলটি চমক দেখিয়েছে।

সেখানেও তাদের প্রার্থীরা অন্যদের চেয়ে ভালো ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। দলটি বলছে, চরমোনাই পীরের ব্যাপক জনসমর্থন ও সাংগঠনিক ভীত শক্তিশালী থাকায় বরিশাল সিটি নির্বাচনে তারা অনেক ভালো ফল করবে। কালোটাকা, পেশিশক্তির বিষয়ে মানুষ এখন সচেতন হওয়ায় মানুষ তাদের প্রার্থীকেই বেছে নেবে। দলটির মহাসচিব ইউনুছ আহমাদ জানান, জনগণ যদি ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়, ভোট যদি সুষ্ঠু হয়, তবে আমাদের একটা ভালো সাড়া পাব।

 

আমরা শতভাগ নির্বাচনমুখী দল, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে মনে করলেই আমরা নির্বাচনে অংশ নেব। আমরা নির্বাচনী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি, পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ভাবে কাজ করতে দেওয়ার কথাও বলে আসছি। আমাদের আন্দোলন এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি দুটোই নিয়ে রাখছি। বরিশাল সিটি নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই উলেখ করে কেউ জাল ভোট দিতে আসলে, কোন অসৎ উপায় অবলম্বন করতে চাইলে তাদের প্রতিহত করা হবে বলে হুশিয়ারী দিয়েছেন তিনি।