৩৮ বছরের ১৮ বছরই কাটিয়েছেন বিছানায় শুয়ে হাফেজের মানবেতর জীবন

0
45

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি॥ হাফেজ নজরুল ইসলাম। জীবন থেকে ৩৮ বছর পার করেছেন তিনি। পেছনে ফেলে আসা ৩৮ বছরের ১৮ বছরই কাটিয়েছেন বিছানায় শুয়ে। তাও আবার এক কাতে! টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মাহমুদ নগর ইউনিয়নের কুকুরিয়া গ্রামের মৃত মো. মরতুজ আলী সরকার ও মৃত মোছা. কদভানুর সন্তান তিনি।

যমুনার পাড় ঘেষা তার বাড়িটি। যমুনার ভাঙ্গনে জমাজমি থেকে এখন নিঃস্ব তারা। শুরু থেকেই পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক ছিল। চার বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েন নজরুল ইসলাম। কৃষি কাজ করা পরিবারের একমাত্র উপার্জিত বাবাকে হায়িয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপরও কষ্ট উপেক্ষা করে হেফজ বিভাগ শেষ করেন তিনি।

হাফেজ হয়েই দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়নের মঙ্গলহোড় জামে মসজিদে ইমামের চাকরি নেন। দুবছর কাটতে না কাটতেই আক্রান্ত হন অজানা রোগে। হাত-পা ফুলে যায়। প্রচণ্ড ব্যাথাও শুরু হয়। তখন ১৯৯৯ সাল। ৬শ টাকা মাইনেতে চাকরি। এতো অল্প আয়ে সংসার চালিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেননি তিনি। দাঁড়িয়ে থাকতে না পারায় ইমামের চাকরিটাও চলে যায়। সুষম খাবার তো দূরের কথা, স্বাভাবিক খাবার যোগাতে ব্যর্থ আর অর্থাভাবে চিকিৎসা করতে না পারায় ওই বছরে বিছানায় পড়েন তিনি।

ভরসা ঝাড়-ফুঁক আর পানি পড়া। অবিবাহিত হওয়ায় সেবার জন্যও পরনির্ভরশীল হতে হলো তাকে। পাঁচ ভাই-বোন থাকার পরও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন তারা। দায়িত্ব না নিয়ে থাকতে পারলেন না ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা। চেয়ে চিন্তে খাবার যোগাতে পারলেও চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি বৃদ্ধা মায়ের পক্ষে। অযত্ন আর বিনা চিকিৎসায় বছর খানেকের মধ্যেই বিছানা থেকে ওঠা বসা বন্ধ হয়ে গেল তার।

পাঁচ বছর আগে তাকে দেখাশোনা করার একমাত্র মা-ও মারা যান। এর পর থেকে অসুস্থ নজরুল ইসলাম আরো অসহায় হয়ে পড়েন। এখন তিনি গ্রামেই তার বড় বোন রাবেয়া খাতুন ও বোন জামাতা রহম আলীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। কিন্তু রহম আলী দিনমজুর হওয়ায় এরাই দিন আনে, দিন খায়। আত্মীয়তার টানে তা থেকেই সহযোগিতা করা। মৃত্যু খুব সন্নিকটে ভেবে চিকিৎসার পরিবর্তে বিভিন্ন মহল থেকে ছোট ছোট দানের টাকা দিয়ে তাকে খাওয়াচ্ছেন ওই বোন।

বর্তমানে তার শরীরটা কঙ্কালের মতো। হাত পা বেঁকে গেছে। ঘাড়টা ডান দিকে আটকে গেছে। শরীরের এক অংশ উঁচু করে পুরো দেহটা নাড়ানো যায়। তরল বস্তু খাওয়াতে হয় পাইপ দিয়ে। হাত-পায়ের হারের যুক্ত স্থানগুলো বেঁকে গেছে। পুরো দেহটা শক্ত একটা বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এভাবেই এক কাতে তিনি শুয়ে আছেন ১৮ বছর ধরে। তবে তার ব্রেইন শক্তি একটুও হ্রাস পায়নি। শুয়ে সারাক্ষণ কুরআন পড়ছেন। ইশারায় নামাজও আদায় করছেন। পরিচিতদের কণ্ঠ শুনলেই বুঝতে পারেন। শরীরটা জড় বস্তুর মতো হলেও কণ্ঠটা রয়েছে ঠিক আগের মতো।

মৃত্যুকে পাশে রেখেই হঠাৎ বাঁচার স্বপ্ন দেখল নজরুল ইসলাম। ঢাকার পিজি হাসপাতাল থেকে টাঙ্গাইল ফাতেমা ক্লিনিকে আসা মেডিসিন ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. মিজানুর রহমানের সন্ধান মেলে। গত চার মাস ধরে তিনি চিকিৎসা করছেন।

চিকিৎসক জানান, বাত ব্যথা থেকে তার এ অবস্থা। এখন নার্ভগুলো ঠিকমতো কাজ করতে না পারায় এ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা হলেও চার মাসেই অনেকটা পরিবর্তন এসেছে তার। কিন্তু চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহল হওয়ায় মাঝে মাঝে ওষুধ বন্ধ রাখতে হচ্ছে তাকে। যেখানে দুবেলা খাবার জোটে না, সেখানে ওষুধ নিয়মিত করবে কীভাবে!

অসুস্থ হাফেজ নজরুল ইসলাম জানান, আমি সুস্থ হব। হজরত আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর অসুস্থতার পর সুস্থ হয়েছিলেন। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ চাইলে- আমিও সুস্থ হব।

বর্তমানে যে চিকিৎসা চলছে, তাতে প্রতিমাসে ওষুধ খরচ লাগে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। ওষুধ খেয়ে আগের তুলনায় অনেকটা ভাল। এখন ধীরে ধীরে হাতে-পায়ে শক্তি ফিরছে। এর আগে বোধশক্তিও কমে গিয়েছিল। কিন্তু টাকার অভাবে ঠিকমত ওষুধ খেতে পারছি না।

সমাজের বিত্তবানদের প্রতি তার চিকিৎসার সহযোগিতার আবেদন জানান তিনি।

চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান জানান, গত চার মাস ধরে তিনি চিকিৎসা করছেন। দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা হলেও চার মাসেই অনেকটা পরিবর্তন এসেছে তার। ১৮ বছরের রোগ। শুরুতে চিকিৎসা নিলে অল্প সময়ে ভালো হতো। বর্তমানে চিকিৎসায় তিনি অনেকটা ভালোর দিকে। আশা করছি, নিয়মিত চিকিৎসা নিলে সুস্থ হয়ে উঠবেন।

মাহমুদ নগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানান, আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তাকে একটি প্রতিবন্ধী কার্ডের ব্যবস্থাও করেছি।

তাকে সুস্থ করার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ নেই পরিবারের। তার নিজ গ্রাম ও চাকরির স্থান মঙ্গলহোড় গ্রামের মানুষের সহযোগিতায় এতোদিন চিকিৎসা চলে আসছিল। একজনে কতবার সাহায্য করবে। এখন চিকিৎসা বন্ধের উপক্রম।

একজন কুরআনে হাফেজকে বাঁচাতে দেশের বিত্তবানদের কাছে আবেদন করেছেন অসুস্থ হাফেজ নজরুল ইসলাম ও তার পরিবারসহ স্থানীয়রা।