কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে শবে বরাত

0
223

 

আমাদের সামনে এসে গেছে অতি ফজিলতের একটি মাস শাবান। প্রিয় নবিজী (সা.) এ মাসেও দোয়া করতেন যেভাবে রজব মাসে দোয়া করতেন: ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রজব ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাযান।’ অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন এবং আমাদেরকে রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন। আমীন।

শাবান মাসে তিনি অনেকগুলো নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি প্রিয় নবি (সা.) কে রমজান ছাড়া আর কোনো পূর্ণ মাস রোজা রাখতে দেখিনি। আর শাবান মাস ছাড়া আর কোনো মাসে এত অধিক পরিমাণ নফল রোজা রাখতে দেখিনি।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

সাহাবি উসামা বিন যায়েদ (রা.) বর্ণনা করেন- ‘আমি প্রিয় নবিজী (সা.)-কে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! শাবান মাসে আপনি যত নফল রোজা রাখেন; অন্য কোনো মাসে আপনাকে এত নফল রোজা রাখতে দেখি না। প্রিয় নবি (সা.) এরশাদ করলেন, রজব ও রমজান– এ দুটো মাসের মাঝখানের এ মাসটি সম্পর্কে অনেকেই আসলে গাফেল হয়ে থাকে। এ মাসে মানুষের আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই, আমার আমল যখন পেশ করা হয়, আমি যেন তখন রোজা অবস্থায় থাকি।’ (আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে খোযাইমা)।

তবে শাবান মাসের ১৫ তারিখে শুধু একটি রোজা রাখার ব্যাপারে কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। আর আমাদের সামনে আসছে মধ্য শাবানের রাতটি- যা অনেক দেশে ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত। এ রাতের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে তুলে ধরা হলো-

প্রত্যেক মুসলমানই অবগত আছেন, ইসলামি শরিয়তের মূল উৎস দুটি– কুরআন ও হাদিস। কুরআন ও হাদিসে যে ইবাদতের যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে একটু বেশি বা কম গুরুত্ব দেয়ার অধিকার কেন মুসলমানের নেই। শবে বরাত নামক বিষয়টি কুরআন-হাদিসে আদৌ উল্লেখ করা হয়নি। এটাই হচ্ছে- উম্মতের মুহাক্বিক আলিম ও ইমামদের মতামত। কেউ কেউ দাবি করে থাকেন সুরা আদ-দুখানে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ অর্থাৎ বরকতময় রাত বলতে শবে বরাতকেই বোঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তাফসিরে ইবনে কাসির, কুরতুবি ইত্যাদির রেফারেন্স দেয়া হয়। এবার নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থসমূহে এ ব্যাপারে কি বলা হয়েছে, তা তুলে ধরা হলো:

ইমাম ইবনে কাসির (রহ) বলেন, বরকতময় রাত বলতে সুরা দুখানে শবে ক্বদরকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, এখানে কুরআন নাজিলের কথা বলা হয়েছে। আর সেটাতো সূরা ক্বদরে স্পস্ট করেই বলা আছে। আর কুরআন যে রমজান মাসেই নাজিল হয়েছে সেটাও সুস্পস্ট করে বলা হয়েছে সূরা বাক্বারায়।

তিনি আরও বলেন, কেউ যদি বলে- বরকতময় রাত বলতে মধ্য শাবানের রাতকে বোঝানে হয়েছে যেমনটি ইকরামাকর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, তাহলে সে প্রকৃত সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করল।

শবে বরাতে মানুষের হায়াত, মউত ও রিজিকের বার্ষিক ফয়সালা হওয়াসংক্রান্ত যে হাদিসটি উসমান বিন মোহাম্মদ থেকে বর্ণিত, সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, হাদিসটি মুরসাল। অর্থাৎ, হাদিসের প্রথম বর্ণনাকারী হিসেবে যে সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদিসটি শুনেছেন, তার কোনো উল্লেখ নেই। ফলে এমন দুর্বল হাদিস দিয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসের অকাট্য বক্তব্যকে খণ্ডন করা যায় না। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ তাফসির ইবনে কাসির, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা ৩১৬১)।

ইমাম কুরতুবি বলেন, বরকতময় রাত বলতে ক্বদরের রাতকে বোঝানো হয়েছে, যদিও কেউবা বলেছেন, সেটা মধ্য শাবানের রাত। ইকরামাও বলেছেন, সেটি হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত। তবে প্রথম মতটি অধিকতর শুদ্ধ। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি এই কুরআন লাইলাতুল ক্বদরে নাজিল করেছি।’

এ প্রসঙ্গে মানুষের হায়াত, মউত, রিজিক, ইত্যাদির ফয়সালা শবে বরাতে সম্পন্ন হয় বলে যে রেওয়ায়েত এসেছে, সেটাকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেন। তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন- সহিহ-শুদ্ধ কথা হচ্ছে, এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর।

অতঃপর তিনি প্রখ্যাত ফকিহ কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবির উদ্ধৃতি পেশ করেন- অধিকাংশ আলিমদের মতামত হচ্ছে, এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর। কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন এটা মধ্য শাবানের রাত। এ কথাটি একেবারেই বাতিল। কারণ, আল্লাহ স্বয়ং তার অকাট্য বাণী কুরআনে বলেছেন, ‘রমজান হচ্ছে ওই মাস যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে।’ এখানে তিনি মাস উল্লেখ করে দিয়েছেন। আর বরকতময় রাত বলে লাইলাতুল ক্বদরকে উল্লেখ করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ মাসটিকে রমজান থেকে সরিয়ে অন্য মাসে নিয়ে যায়, সে মূলত আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে বসে। মধ্য শাবানের রাতটির ফজিলত এবং এ রাতে হায়াত-মউতের ফয়সালাসংক্রান্ত কোনো একটি হাদিসও সহিহ এবং নির্ভরযোগ্য নয়। কাজেই কেউ যেন সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ডঃ ১৬, পৃষ্ঠাঃ ১২৬-১২৮)।

ইমাম তাবাবি তাফসিরে তাবাবিতে বরকতময় রাতের ব্যাখায় উল্লেখ করেন, কাতাদাহ (রা.) কর্তৃক বর্ণিত এ রাত লাইলাতুল ক্বদর-এর রাত। প্রতি বছরের যাবতীয় কিছুর ফায়সালা এ রাতেই সম্পন্ন করাহয়। অতঃপর ইকরামা থেকে বর্ণিত মধ্য শাবানের মতামতটিও উল্লেখ করেন। পরিশেষে তিনি মন্তব্য করেন, লাইলাতুল ক্বদরের মতটাই সহিহ। কারণ, এখানে কুরআন নাজিলের কথা বলা হয়েছে। (তাফসিরে তাবারি, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা ২১২-২২৩)।

আল্লামা মুহাম্মদ আল আমীন আশ-শিনকীতী (রহ) সূরা দুখানের বরকতময় রাতের তাফসিরে বলেন, এটি হচ্ছে রমজান মাসের ক্বদরের রাত। মধ্য শাবানের রাত হিসেবে সেটিকে বুঝানো হয়েছে মনে করা– যেমনটি ইকরামা থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে– মিথ্যা দাবি ছাড়া আর কিছু নয়। এ দাবিটি কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী। নিঃসন্দেহে হকের বিপরীত যে কোন কথাই বাতিল। কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী যে হাদিসগুলো কেউ কেউ বর্ণনা করে থাকেন, যাতে বলা হয়- এ রাতটি হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত, সেই হাদিসগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। সেগুলোর কোনোটার সনদই সহিহ নয়।

ইবনুল আরাবিসহ মুহাক্কিক ইমামরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বলেছেন- আফসোস, ওইসব মুসলমানের জন্য যারা কুরআনের সুস্পষ্ট বিরোধিতা করে কুরআন ও সহিহ হাদিসের দলিল ছাড়াই। (বিস্তারিত দেখুন, আদওয়াউল বায়ান, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৩১৯)।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতি শফী (রহ.) এ বিষয়ে মারেফুল কুরআনে বলেন, বরকতময় রাত বলতে অধিকাংশ তাফসিরবিদদের মতে- এখানে শবে ক্বদর বুঝানো হয়েছে যা রমজান মাসের শেষ দশকে হয়। কেউ কেউ আলোচ্য আয়াতে বরকতের রাত্রির অর্থ নিয়েছেন শবে বরাত। কিন্তু এটা শুদ্ধ নয়। কেননা, এখানে সর্বাগ্রে কুরআন অবতরণের কথা বলা হয়েছে। আর কুরআন যে রমজান মাসে নাজিল হয়েছে, তা কুরআন দ্বারাই প্রমাণিত। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ মারেফুল কুরআন, পৃষ্ঠা ১২৩৫)।

শবে বরাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো দুই প্রকার। প্রথমত, শবে বরাতে কতো রাকাত নামাজ পড়তে হবে, সূরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসি প্রতি রাকাতে কতবার করে পড়তে হবে ইত্যাদি এবং সে আমলগুলোর বিস্তারিত সওয়াবের ফিরিস্তিসংক্রান্ত হাদিসগুলো একেবারেই জাল এবং বানোয়াট। আর দ্বিতীয় প্রকার হাদিসগুলো, এ রাতের ফজিলত, ইবাদতের গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ক। এসব হাদিসের কোনোটাই সহিহ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। বরং সবগুলোই দুর্বল। তবে, মউজু (জাল বা বানোয়াট) নয়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। সিহাহ সিত্তার (ছয়টি গ্রন্থের) সবগুলো হাদিসই কি সহিহ? হাদিস বিশারদরা প্রায় একমত যে, বুখারি ও মসলিম– এ দুটো গ্রন্হের সবগুলো হাদিসই সহিহ পর্যায়ের। কোনো যইফ (দুর্বল) হাদিসের অবকাশ নেই এ দুটো গ্রন্থে। আর বাকি চারটি গ্রন্থের অধিকাংশ হাদিস সহিহ। তবে, বেশ কিছুসংখ্যক দুর্বল হাদিসও রয়েছে সেগুলোর মধ্যে। শবে বরাত সংক্রান্ত কোনো একটি হাদিসও বুখারি ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে আসেনি। আর বাকি চারটি গ্রন্থে বা অন্যান্য আরও কিছু গ্রন্থে এ সংক্রান্ত যে হাদিসগুলো এসেছে, তার একটিও সহিহ হাদিসের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। শবে বরাত সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস, হাদিস বিশারদদের মন্তব্য সহকারে উল্লেখ করা হল:

১. আলী (রা.)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘১৫ শাবানের রাতে তোমরা বেশি বেশি করে ইবাদত কর এবং দিনে রোজা রাখ। এ রাতে আল্লাহ তাআলা সূর্যাস্তের সাথে সাথেই দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন- ‘কে আছ আমার কাছে গুনাহ মাফ চাইতে? আমি তাকে মাফ করতে প্রস্তুত। কে আছ রিজিক চাইতে? আমি তাকে রিজিক দিতে প্রস্তুত। কে আছ বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে বিপদমুক্ত করতে প্রস্তুত। কে আছ …’ এভাবে (বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম নিয়ে) ডাকা হতে থাকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত।’ (ইবনে মাজাহ)

এ হাদিসটি যে আদৌ সহিহ নয়, সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম হাফেজ শিহাব উদ্দিন তার যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হাদিসটির সনদ যইফ (দুর্বল), কারণ হাদিসটির সনদের মাঝখানে আবু বকর বিন আবু সাবরা নামে একজন রাবী (বর্ণনাকারী) অনির্ভরযোগ্য। এমনকি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনু মাইন তার ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন, ‘লোকটি মিথ্যা হাদিস রচনা করে থাকে।’ (দেখুনঃ সুনান ইবনে মাজাহ, মন্তব্য ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল বারী, পৃষ্ঠা ৪৪৪)।

২. আয়েশা (রা.)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘আমি এক রাতে দেখতে পাই যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার পাশে নেই। আমি উনার সন্ধানে বের হলাম। দেখি যে, তিনি জান্নাতুল বাকি (কবর স্থানে) অবস্থান করছেন। ঊর্ধ্বাকাশ পানে তার মস্তক ফেরানো। আমাকে দেখে বললেন, আয়েশা, তুমি কি আশঙ্কা করেছিলে যে আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) তোমার প্রতি অবিচার করেছেন? আমি বললাম, এমন ধারণা করিনি, তবে মনে করেছিলাম, আপনার অন্য কোনো বিবির সান্নিধ্যে গিয়েছেন কিনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহ তাআলা ১৫ শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের সমুদয় বকরির সকল পশমের পরিমাণ মানুষকে মাফ করে দেন।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)।

ইমাম তিরমিজি হাদিসটি বর্ণনা করে নিজেই মন্তব্য করেছেন, আয়েশা (রা.)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত এই হাদিসটি হাজ্জাজ বিন আয়তাআহ্ ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেছেন বলে জানা নেই।

ইমাম বোখারি বলেছেন, এ হাদিসটি যইফ (দুর্বল)। হাজ্জাজ বিন আয়তাআহ্ বর্ণনা করেছেন ইয়াহিয়া বিন আবি কাসির থেকে। অথচ হাজ্জাজ ইয়াহিয়া থেকে আদৌ কোনো হাদিস শুনেননি। ইমাম বোখারি আরও বলেছেন, এমনকি ইয়াহিয়া বিন আবি কাসিরও রাবী ওরওয়া থেকে আদৌ কোনো হাদিস শুনেননি। (দেখুন- জামে তিরমিজী, সাওম অধ্যায়, মধ্য শাবানের রাত, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৮)।

৩. আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)বলেছেন, ’১৫ শাবানের রাতে আল্লাহ তাআলা নিচে নেমে আসেন এবং সকল মানুষকেই মাফ করে দেন। তবে মুশরিককে এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টিকারীকে মাফ করেন না।’ (ইবনে মাজাহ)।

এ হাদিসটির ব্যাপারে হাফেজ শিহাব উদ্দিন তার যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন- এর সনদ যইফ (দুর্বল)। একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আব্দুল্লাহ বিন লাহইয়াহ্ নির্ভরযোগ্য নন। আরেকজন রাবী ওয়ালিদ বিন মুসলিম তাফলীসকারী (সনদের মধ্যে হেরফের করতে অভ্যস্ত) হিসেবে পরিচিত।

প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আসসিন্দী বলেছেন, আরেকজন রাবী আদদাহহাক কখনও আবু মুসা থেকে হাদিস শুনেননি। শবে বরাতসংক্রান্ত বর্ণিত সবগুলো হাদিসের সনদের মধ্যেই এ জাতীয় দুর্বলতা বিদ্যমান থাকার কারণে একটি হাদিসও সহিহর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

অধিকাংশ মুহাদ্দেসিনের মতে, যইফ হাদিসের ওপর আমল করা শরিয়তে জায়েজ নেই। অধিকাংশ ফুকাহা আইম্মায়ে কেরাম যইফ (দুর্বল) হাদিস দ্বারা শর্ত সাপেক্ষে আমল করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন।

শর্তগুলো নিম্নরূপ:

১। খুব বেশি যইফ (দুর্বল) পর্যায়ের না হওয়া।

২। শুধুমাত্র ফাজায়েল অধ্যায়ের হওয়া। অর্থাৎ ফাজায়েল অধ্যায় ব্যতীত অন্য কোনো অধ্যায়ের যইফ হাদিসেরভিত্তিতে কোনো প্রকার আমল করা যাবে না।

৩। আমল করার সময় সহিহভাবে প্রমাণিত হওয়ার ধারণা না রাখা। অর্থাৎ, এ ধারণা রাখতে হবে যে হাদিসটি সহিহভাবে প্রমাণিত নয়।

৪। কুরআন ও সহিহ হাদিসের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট যইফ হাদিসটি কুরআন বা সহিহ হাদিসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

এসব মূলনীতির আলোকে শবে বরাতের আমল করা যেতে পারে বলে অনেক ওলামায়ে কেরাম মতামত দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন আসে আমল করতে হলে কীভাবে করা যাবে।

প্রথমত. ব্যক্তিগতভাবে কিছু ইবাদত-বন্দেগি করা যেতে পারে। সে জন্যে মসজিদে সমবেত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করার জন্য ওয়াজ-নসিহত, জিকির ইত্যাদির আয়োজন করা যাবে না। (দেখুন, ফাতাওয়া শামী, ইমাম বিন আবেদীন, পৃষ্ঠা ৬৪২)। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম এমনটি করেননি। তাই সে ত্বরিকার বাইরে ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতা আবিষ্কার করলে সেটা হয়ে যাবে বেদাত।

দ্বিতীয়ত. হায়াত, মউত, রিজিক ইত্যাদির ফয়সালা এ রাতে হয়, এটা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, এসব ফয়সালা যে লাইলাতুল ক্বদরে হয়, তা সুস্পষ্টভাবে কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

তৃতীয়ত. আমাদের দেশে (বাংলাদেশে) আলোকসজ্জা ও আতশবজির যে তামাশা করা হয়, তা প্রকাশ্যে বিদাত। সে ধারণা থেকে কোন এলাকায় এ রাতের নাম হচ্ছে বাতির রাত। এসব ধারণা ইসলামি শরিয়তে হিন্দুদের দিওয়ালি অনুষ্ঠান থেকে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রহ.)। হালুয়া-রুটি বিলি-বণ্টনের কার্যক্রমও বিদাত। (দেখুন: ফাতাওয়া শামীয়া, ইমাম বিন আবেদীন, পৃষ্ঠা ৬৪২)। এসব অনেক আমল শিয়াদের কাছ থেকে উপ-মহাদেশের মুসলমানরা গ্রহণ করেছেন বলে মুফতী রশীদ আহমদ লুদিয়ানী উল্লেখ করেছেন। (দেখুন: সাত মাসায়েল, শবে বরাতে শিয়াদের ভ্রষ্টতা, পৃষ্ঠা ৩৯-৪২)।

চতুর্থতঃ নফল ইবাদতের জন্য সারারাত মসজিদে এসে জেগে থাকা রাসুল (সা.)-এর সুন্নতবিরোধী। তিনি নফল ইবাদত ঘরে করতে এবং ফরজ ইবাদত জামাতের সাথে মসজিদে আদায় করতে তাগিদ করেছেন। আর সারারাত জেগে থেকে ইবাদত করাটাও সুন্নতবিরোধী। প্রিয় নবিজী (সা.) সব রাতেরই কিছু অংশ ইবাদত করতেন, আর কিছু অংশ ঘুমাতেন। উনার জীবনে এমন কোনো রাতের খবর পাওয়া যায় না, যাতে তিনি একদম না ঘুমিয়ে সারা রাত জেগে ইবাদত করেছেন।

পঞ্চমত. শবে বরাতের দিনে রোজা রাখার হাদিস একেবারেই দুর্বল। এর ভিত্তিতে আমল করা যায় না বলে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম ও ফকিহ মুফতি মাওলানা তাকী উসমানী সাহেবের সুস্পষ্ট ফাতাওয়া রয়েছে। শবে বরাত, কবর যিয়ারত ইত্যাদি অনেক আমলেরই কোনো সহিহ দলিল না থাকার কারণে উপমহাদেশর প্রখ্যাত আলেম ও ফকিহ মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়নবি, হাক্বীকুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রাহ.)-এর সাথে বহু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন।

ষষ্ঠত. শবে বরাতের রোজার পক্ষে যেহেতু কোনো মজবুত দলিল নেই, তাই যারা নফল রোজা রাখতে চান, তারা আইয়ামে বিজের তিনটি রোজা– ১৩, ১৪, ১৫ রাখতে পারেন। এর পক্ষে সহিহ হাদিসের দলিল রয়েছে। শুধু একটি না রেখে এ তিনটি বা তার চেয়েও বেশি রোজা রাখতে পারলে আরও ভালো। কারণ, শাবান মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সবচেয়ে বেশি পরিমাণ নফল রোজা রেখেছেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসের উপর আমল করার তাওফিক দান করুণ। আমীন।

লেখক:
ফিরোজ মাহমুদ,
মাদরাসা শিক্ষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।