কুয়াকাটায় ফয়েজ মিয়ার শেষ চিহ্নটুকু সাগর গর্ভে বিলীন

0
616

এম জাকির হোসাইন, কুয়াকাটা প্রতিনিধি।।

কুয়াকাটার ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান আজ শুধুই স্মৃতি বহন করছে। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এ বাগানটি ছিলো ভালোলাগার দুর্বার শিহরণ। সাগরকন্যার যৌবনের পূর্ণতা পেয়েছিলো এ বাগানের রূপ-লাবণ্যে। প্রকৃতির প্রণয়ধন্য এ বাগানে ঠাঁই নিতো দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক। পর্যটকদের মনে যেন নেশা ধরাতো বাগানের নির্মল প্রশান্তির ছোঁয়া। প্রকৃতির ধারাবাহিক রুদ্ররোষে বার বার এর যৌবনের ওপর পড়েছে অনাহুত নির্দয় আঘাত। সেই নিষ্ঠুরতার চরম সীমায় আত্মাহুতি দিতে হয়েছে শেষ চিহ্নটুকু বৃক্ষপ্রেমী ফয়েজ মিয়ার রেস্ট হাউস।

নিম্নচাপের কারণে ভারী বর্ষণ আর প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে সাগর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে ফয়েজ মিয়ার বিশ্রামাগারসহ বাগানের শেষ অংশ। তবু অস্তিত্বের দাবী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পাকা টয়লেটের একাংশ। ঢেউয়ের তান্ডবের শিকার তার কাঠের বিশ্রাম ঘরটি মাথা থুবড়ে পড়েছে বীচে। ক্ষুধার্ত সাগরের বৈরী আচরণের কাছে যেন হার মেনেছে এ ঘরটি। নীরবে যেন কেঁদে বেড়ায় সৃষ্টিশীল মানুষের স্মৃতিকর্ম। ঢেউয়ের আঁচড়ে সরে গেছে বালুর স্তর। বেরিয়ে পড়েছে বিভিন্ন গাছের শিকড়। এক এক করে ধ্বংসের কোলে ঢলে পড়ে বাগানের অবশিষ্ট গাছ।

জানা গেছে, ১৯৬০ সালে ১৯৭ একর সরকারি জমি ৯৯ বছরের লিজ নিয়েছিলো ফয়েজ মিয়া। ফার্মস এন্ড ফার্মস নামকরণ করে ওই জমিতেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন নান্দনিক এ নারিকেল বাগান। লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনি সাজিয়ে তোলেন বাগানটি। ক্রয় করেন নানা প্রজাতির গাছ। নারিকেল গাছ ছাড়াও এ বাগানে ছিলো কাজু বাদাম, পেয়ারা, লেবু, বড়ই, আম, সবেদা, কাঠাল, সুপারি, জাম ইত্যাদি গাছ। এছাড়াও কড়ই, রেন্ট্রি, তাল, মেহগনি, চাম্বল, অর্জুন, ও শাল কাঠের গাছ ছিলো ওই বাগানে পরিপূর্ণ। মিষ্টি পানির জন্য তিনি খনন করেন পাঁচটি পুকুর। পুকুরের চার পাড়েই দন্ডায়মান ছিলো দৃষ্টিনন্দন নারিকেল গাছের সারি।

বাগানের জন্ম ইতিহাসের সাথে জড়িত ৬৫ বছরের রশিদ মিয়ার সাথে আলাপ হলে তিনি আবেগাপ্লুত কন্ঠে বলেন, মোর যৌবনের দিনগুলা ওই বাগানের লগে মিশ্যা আছে। ফয়েজ মিয়া ভালো মানুষ আলহে। ১২ বছর বয়সে হে মোরে ওই বাগানে কামের সন্ধান দ্যায়। হ্যারপর কত্তো বচ্ছর কাইট্যা গ্যাছে! কত্তো কথা মনে পড়ে! এহন বাগান নাই। আছে ক্যাবল স্মৃতি।

প্রতি বছর অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোঁ’তে সাগরের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ে কিনারায়। জোয়ারের পানিতে বালু ধুয়ে নেওয়ায় বিভিন্ন জাতের গাছ দুর্বল হয়ে ভেঙ্গে পড়ে সৈকতে। গত ২০ বছর ধরে ক্রমশ ¯্রােতের তোড়ে বিলীন হতে থাকে প্রায় ২০০ একর জমি। এভাবেই হ্রাস পায় বাগানের আয়তন।

বাগানটি বিলীন হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করলেন বাগানের জন্ম ও ধ্বংসের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী ষাটোর্ধ মো. হাসান ঘরামি। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, সাগর পাড়ে ছিলো ঘন জঙ্গল। প্রথমে তা পরিস্কার করানো হয়। ১৯৬৪ সালের দিকে ফয়েজ মিয়া বাগানের কাজ হাতে নেন। লাখ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা বাগান পর্যটকসহ এলাকার মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। কুয়াকাটার সৌন্দর্য বর্ধনে এ বাগানটি ছিলো দর্শনীয়। এটি রক্ষায় সরকারের ছিলো না কোন উদ্যোগ। বাগানের সেই স্মৃতি মনে পড়লে বুকটা কষ্টে ভারী হয়ে ওঠে।

প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলার শেষ দৃশ্যায়ন ছিলো গত নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট ভারী বর্ষণ ও উন্মাদ ঢেউয়ের তান্ডব। এর ফলে হারিয়ে যায় ওই বাগানের শেষ অংশ। ফয়েজ মিয়া নেই, তার নারিকেল বাগানও নেই। আজ তা বিলীন হয়ে গেছে কালের করাল গ্রাসে। তবু তিনি বেঁচে আছেন তার সৃষ্টিকর্মে। বেঁচে আছে তার নারিকেল বাগান–স্মৃতির আঙ্গিনায় কিংবা ইতিহাসের পাতায়।