বঙ্গবন্ধুর সমবেদনা জানানোর চিঠি আজো তাদের স্মৃতি

0
103

স্টাফ রিপোর্টার :: মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক সেনাদের হাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের একই পরিবারের তিনজন পুরুষ সদস্য শহীদ ও একজন নারী সদস্য অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে দেশ স্বাধীনের পর শহীদ পরিবার হিসেবে ওই পরিবারের সদস্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত দুইটি সমবেদনা ও অনুদানের চিঠি পেয়েছিলেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪৯ বছর পর আজো বঙ্গবন্ধুর সেই চিঠি পরম যত্নে রেখেছেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলা সদরের টিকাসার মহল­ার দেবনাথ পরিবার। বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিগুলো তাদের উত্তরসূরীদের জন্য স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে পরিবারের শত অভাবের মাঝেও তৎকালীন সময়ে অনুদানের টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করেননি দেবনাথ পরিবারের সদস্যরা। তবে একই পরিবারের তিনজন শহীদ হওয়া সত্বেও আজো ওই পরিবারটি শহীদ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি এবং একজন সদস্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও অদ্যবর্ধি তিনি তালিকাভূক্ত হতে না পারায় ক্ষোভ বিরাজ করছে দেবনাথ পরিবারের সদস্যদের মাঝে। তবে ওই পরিবারের উত্তরসূরীরা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত চিঠিগুলোই আমাদের কাছে অনেক বড় স্বীকৃতি বহন করে চলছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত দুইটি চিঠির মধ্যে একটি চিঠি শহীদ রাধাগোবিন্দ দেবনাথের স্ত্রী চন্দ্রাবলী দেবনাথের কাছে লেখা ছিল। ১৯৭২ সালের ১১ আগস্ট ইস্যুকৃত বঙ্গবন্ধু তার চিঠির শুরুতেই চন্দ্রাবলী দেবনাথকে উদ্দেশ্য করে উলে­খ করেন-প্রিয় বোন, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য স্বামী আত্মোৎসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দুঃখের সহিত জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতিও রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি। এমন নিঃস্বার্থ মহান দেশপ্রেমিকের স্ত্রী হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যি আপনি ধন্য হয়েছেন। ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল’ থেকে আপনার পরিবারের সাহায্যার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসনের নিকট দুই হাজার টাকার চেক প্রেরিত হল। চেক নম্বর সিএ ০০২৩৯১। আমার প্রাণভরা ভালবাসা ও শুভেচ্ছা নিন। ইতি-শেখ মুজিব।

সূত্রমতে, একইভাবে ১৯৭৩ সালের ২৫ জানুয়ারি ইস্যুকৃত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ রামেশ্বর দেবনাথের স্ত্রী গীতা রানী দেবনাথের কাছেও অনুরূপ সমবেদনা ও অনুদানের চিঠি প্রেরণ করেছিলেন।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট ছিন্টু বলেন, ১৯৭১ সালের ১১ জৈষ্ঠ্য স্থানীয় রাজাকারদের উপস্থিতিতে পাকসেনারা টিকাসার গ্রামের বাসিন্দা দেবেন্দ্র কুমার দেবনাথ, তার বড় পুত্র রাধা গোবিন্দ দেবনাথ ও সেজ পুত্র রামেশ্বর দেবনাথকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার পর বাড়ির পাশ্ববর্তী খালের পানিতে লাশ ভাসিয়ে দেয়। এছাড়া বাড়ির নারী সদস্যদের পাকসেনারা অমানবিক নির্যাতন করে। তিনি আরও জানান, স্বামী ও দুই পুত্রকে হারিয়ে এবং নিজেই নির্যাতিত হয়ে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে মাত্র একমাসের ব্যবধানে মারা যায় শহীদ দেবেন্দ্র কুমার দেবনাথের স্ত্রী চন্দ্রাবতী দেবনাথ। ওইসময় চন্দ্রাবতীর সৎকার করতে না পেরে অতিগোপনে তাদের পরিবারের সদস্যরা দাফন করেছিলেন।

শহীদ রাধা গোবিন্দ দেবনাথের পুত্র নারায়ন দেবনাথ মনু (৭০) বলেন, স্বজনদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে আমি মুক্তিবাহীনিতে যোগ দিয়ে প্রশিক্ষনের জন্য ভারতে গমন করি। এ খবর পেয়ে স্থানীয় রাজাকাররা আমাদের ঘরের মেঝের মাটি খুড়ে পর্যন্ত সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যায়। এছাড়াও রাজাকাররা ওইসময়ে গৌরনদীতে হিন্দু নিধন অভিযানের নামে টিকাসার গ্রামের গৌর কুন্ড, সুধীর বণিকসহ অসংখ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হত্যাসহ বাড়িঘরে লুটপাট করে অগ্নিসংযোগ করে।

নারায়ন দেবনাথ আরও জানান, এসবের বিনিময়ে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ পরিবার হিসেবে আমাদের চিঠির মাধ্যমে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং প্রত্যেক শহীদ পরিবারের জন্য দুই হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর অদ্যবর্ধি আর কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি। শহীদ পরিবার হিসেবেও আর আমরা পাইনি স্বীকৃতি।

ক্ষোভের সাথে নারায়ন দেবনাথ বলেন, শহীদ পরিবার হিসেবে আমরা স্বীকৃতিতো পাইনি বরং একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আমার নাম আজও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অর্ন্তভূক্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, পরিবারের শত অভাবের মাঝেও বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত সেই চিঠি উত্তরসূরীদের জন্য স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে তৎকালীন সময়ে অনুদানের টাকা পর্যন্ত তোলা হয়নি। নারায়ন দেবনাথের স্ত্রী লক্ষী দেবনাথ বলেন, স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর আজো পরম যত্নে রেখেছি বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত দরদ মাখা সমবেদনা ও অনুদানের সেই চিঠিগুলো।

শহীদ পরিবারের উত্তরসূরী বাবু দেবনাথ ও শিপ্রা দেবনাথ বলেন, পরিবারের তিনজন সদস্য শহীদ হওয়ার পরেও আজো শহীদ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও অদ্যবর্ধি তালিকাভূক্ত হতে পারেননি, তাতে আমাদের কোন দুঃখ নেই। শুধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত চিঠিগুলোই আমাদের কাছে অনেক বড় স্বীকৃতি বহন করে চলছে।